জাতীয়আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের পার্থক্য: টেসলা কি বিজ্ঞানী নাকি উদ্ভাবক
আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের পার্থক্য: টেসলা কি বিজ্ঞানী নাকি উদ্ভাবক
আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, যা বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকের কাজকে আলাদা করে। নিকোলা টেসলাকে কোন শ্রেণীতে ফেলা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
দৈনন্দিন আলোচনায় এবং সংবাদমাধ্যমে 'আবিষ্কার' ও 'উদ্ভাবন' শব্দ দুটি প্রায়শই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে শব্দ দুটির অর্থগত ভিন্নতা রয়েছে, যা অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের কাজকেও এই ভিন্নতার কারণে ভুলভাবে দেখা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, জন লগি বেয়ার্ডের টেলিভিশন 'আবিষ্কার' এবং ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা 'আবিষ্কার'কে একই কাজ হিসেবে দেখা হয়। ল্যাবরেটরিতে মাটি ও সমুদ্রের পানি মিশিয়ে আস্ত একটি মহাদেশ তৈরি করা বা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে অজানা দ্বীপে গাছের ডালে ঝুলন্ত টেলিভিশন খুঁজে পাওয়া হাস্যকর শোনায়। এই ধরনের তুলনা থেকেই শব্দ দুটির পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎ বিপ্লবের স্থপতি নিকোলা টেসলাকে কি একজন বিজ্ঞানী বলা হবে নাকি উদ্ভাবক, এই প্রশ্ন প্রায়শই উত্থাপিত হয়। তিনি আসলে কী করেছেন, আবিষ্কার নাকি উদ্ভাবন, তা বুঝতে হলে এই দুটি ধারণার পার্থক্য বোঝা জরুরি।
আবিষ্কার হলো এমন কিছু যা প্রকৃতিতে আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, কিন্তু মানুষের অজানা ছিল। একজন আবিষ্কারক কেবল প্রকৃতির সেই লুকানো নিয়ম বা জিনিসকে সবার সামনে তুলে ধরেন। এটি অনেকটা একটি বিশাল ভল্টের দরজা খুলে ভেতরের লুকানো রহস্য উন্মোচন করার মতো।
যেমন, আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ বল তৈরি করেননি; এই বল তাঁর জন্মের কোটি কোটি বছর আগেও পৃথিবীতে কার্যকর ছিল। নিউটন কেবল আপেল পড়ার ঘটনা থেকে প্রকৃতির এই লুকানো নিয়মটি সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাই তিনি মহাকর্ষ বলের আবিষ্কারক এবং একজন বিজ্ঞানী।
একইভাবে, ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা খুঁজে পেয়েছিলেন, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন ছত্রাক আবিষ্কার করেছিলেন এবং ডিএনএর গঠনও আবিষ্কার করা হয়েছিল। এই সব ক্ষেত্রেই প্রকৃতি আগেই এসব তৈরি করে রেখেছিল, মানুষ কেবল সেগুলোর খোঁজ পেয়েছিল।
অন্যদিকে, উদ্ভাবন হলো এমন কিছু যা এই মহাবিশ্বে আগে কখনোই ছিল না। এটি প্রকৃতির নিয়মকানুন এবং মানুষের কল্পনাশক্তিকে এক করে শূন্য থেকে নতুন কিছু তৈরি করার প্রক্রিয়া। একজন উদ্ভাবক প্রকৃতির নিয়মকে কাজে লাগিয়ে নতুন একটি জিনিস তৈরি করেন, যা প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হয় না।
আদিম যুগের কোনো মানুষ যখন প্রথম একটি পাথরকে গোল করে কেটে চাকা বানিয়েছিল, তখন সে প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন করেনি, বরং সেই নিয়মকে ব্যবহার করে নতুন একটি বস্তু তৈরি করেছিল। চাকা কোনো গাছে ধরে না বা মাটিতে পুঁতে রাখা থাকে না; এটি মানুষের বুদ্ধি খাটিয়ে তৈরি করা একটি জিনিস।
রাইট ভাইদের উড়োজাহাজ, আধুনিক স্মার্টফোন এবং মাথার ওপর ঘোরা ফ্যান—এগুলো সবই উদ্ভাবনের উদাহরণ। এগুলি মানুষের সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ফসল। আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝতে পারলে একজন বিজ্ঞানী এবং একজন উদ্ভাবকের তফাত বোঝা সহজ হয়।
এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং টমাস আলভা এডিসনের উদাহরণ দেওয়া যায়। আইনস্টাইন ছিলেন একজন বিশুদ্ধ পদার্থ বিজ্ঞানী। তাঁর মূল কাজ ছিল মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে তা খুঁজে বের করা।
আইনস্টাইন খাতা-কলম ও ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা করে আপেক্ষিকতার সূত্র আবিষ্কার করেন। তিনি আলো কীভাবে চলে এবং সময় কীভাবে বাঁকা হয় তা গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি নিজের হাতে কোনো টাইম মেশিন বা অন্য কোনো গ্যাজেট তৈরি করেননি, বরং প্রকৃতির নিয়মগুলো আবিষ্কার করেছেন।
অন্যদিকে, টমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন উদ্ভাবক। তিনি নিজের হাতে অনেক নতুন জিনিস তৈরি করেছেন, যা পূর্বে মহাবিশ্বে ছিল না।
মতামত (0)