স্বাস্থ্যআদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা: নবজাতক মৃত্যুর পর লাইসেন্স পুনর্বহাল
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা: নবজাতক মৃত্যুর পর লাইসেন্স পুনর্বহাল
মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর লাইসেন্স বাতিল হয়েছিল। ত্রুটি সংশোধনের পর সরকার শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহাল করেছে।
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ১৯৯৭ সাল থেকে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান। গত ২৯ বছরে এটি নারী ও শিশুস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা দিয়ে মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে এক কোটি ৫৭ লাখেরও বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন।
প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী বহির্বিভাগে সেবা পেতেন এবং চিকিৎসক, নার্স ও কর্মী মিলিয়ে এক হাজার ৭৯০ জন সরাসরি এই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন। অপেক্ষাকৃত কম খরচে চিকিৎসা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা এবং দরিদ্র রোগীদের সেবার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। তবে চলতি বছরের ২৭ মে হাসপাতালের দীর্ঘদিনের সুনামের ওপর বড় ধাক্কা আসে।
ওই দিন ঈদের আগের সকালে পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে অল্প সময়ের ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। একসাথে ছয় শিশুর এমন আকস্মিক মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা, নবজাতক পরিচর্যা, হাসপাতালের অবকাঠামো এবং দায়িত্বশীলতার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যু শুধু স্বজনদের নয়, পুরো স্বাস্থ্য খাতকে নাড়া দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনে হাসপাতালের অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও বায়ুর চলাচল ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়গুলো উঠে আসে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্তে শুধু একটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি; এর সাথে যুক্ত ছিল চিকিৎসাধীন বিপুলসংখ্যক রোগীর ভবিষ্যৎ চিকিৎসা এবং নবজাতক ও প্রসূতি রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা। এতে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে আসে।
লাইসেন্স বাতিলের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ত্রুটি সংশোধন করে পুনরায় কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেয়। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এবং সংশোধিত ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার জন্য পুনঃপরিদর্শনের আবেদন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ওই প্রতিবেদন সন্তোষজনক হওয়ায় সরকার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। গত ২৭ জুলাই সরকার শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালটি পুনরায় চালুর অনুমতি দেয়। এর সাথে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয়।
শর্তগুলো হলো প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে মেনে চলা, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ডিউটি ডাক্তার ও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা। এসব শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। অর্থাৎ, পুনরায় দরজা খুললেও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং নতুন করে মান নিশ্চিত করা, জনবল ও ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং রোগীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
লাইসেন্স বাতিলের পর আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষের অবস্থানেও পরিবর্তন আসে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তারা গভীরভাবে শোকাহত। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
একই সাথে তদারকি জোরদার করা হয় এবং চিকিৎসা প্রটোকল পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নয়, অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কাজও শুরু করা হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আলো-বাতাস চলাচল ও অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তিনজন স্বাধীন পরামর্শকের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের কাজ চলছে।
একই সাথে করপোরেট অফিসের ওপরের বেকারিটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি তদন্তে হাসপাতালের পরিবেশ, বায়ুর চলাচল ও ভবনের উপযুক্ততা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল, তাই এই পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঘটনার পর আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা: শেখ মহিউদ্দিন দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন। গত ১৬ জুন ফাউন্ডেশনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। তার পরিবর্তে পরিচালনা পর্ষদ অধ্যাপক জামালুন্নেসাকে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব দেয়। অধ্যাপক জামালুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে ২৫ বছরের বেশি সময় শিক্ষকতা করেছেন এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। এই নেতৃত্বে পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে নতুন ধারা আনার ইঙ্গিত দেয়।
মতামত (0)