দেশে নবজাতকদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটির হার একটি উদ্বেগের কারণ। ২০২৩ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ নবজাতক বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্মগত ত্রুটি বলতে শিশুর জন্মকালীন সময়ে গঠনগত বা শারীরবৃত্তীয় সমস্যাকে বোঝায়। এই ধরনের ত্রুটির কারণে অনেক সময় নবজাতককে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
নবজাতক শিশুমৃত্যুর প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের জন্য জন্মগত ত্রুটি দায়ী। ডা. প্রণব কুমার চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো নবজাতকের হার ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। শারীরিক জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের অর্ধেক ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গের ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়।
জন্মগত ত্রুটি সাধারণত দুই প্রকারের হয়। কিছু ত্রুটি শিশুর জন্য বড় কোনো ক্ষতির কারণ নয়, যেমন অতিরিক্ত স্তনবৃন্ত বা বাড়তি আঙুল। তবে কিছু ত্রুটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এর মধ্যে রয়েছে ঠোঁটকাটা, তালুকাটা, হার্টে ছিদ্র, পায়ুপথ না থাকা এবং স্পাইনা বায়ফিডা বা মেরুদণ্ডের জন্মত্রুটি।
শিশুর শারীরিক জন্মত্রুটির ১০ শতাংশ জেনেটিক কারণে ঘটে। তবে ১৮ শতাংশ জন্মত্রুটির কোনো নির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। কিছু বিষয় জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায় বলে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রক্ত সম্পর্কীয় বিয়ে।
গর্ভকালীন সময়ে মায়ের ধূমপান (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ), মাদকাসক্তি, রুবেলা, টক্সো, এইডস ও অন্যান্য সংক্রমণ জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়। অন্তঃসত্ত্বা মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। এছাড়া, গর্ভকালে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মা যদি বিভিন্ন টনিক, কবিরাজি বা গাছগাছালির চিকিৎসা এবং ক্ষতিকর ওষুধ সেবন করেন, তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে (যেমন এক্স-রে রেডিয়েশন) আসেন অথবা দূষিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করেন, তাহলে গর্ভের শিশুর ত্রুটি দেখা দিতে পারে।
শিশুর কিছু প্রধান জন্মত্রুটি বংশগত, জিনের গঠনগত ত্রুটি ও ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতার কারণে ঘটে। সদ্য জন্ম নেওয়া প্রতি ১ হাজার শিশুর প্রায় ৮ জনের হার্টে জন্মত্রুটি থাকতে পারে। বিশেষত, অপরিণত বা অকালজাত নবজাতকে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়, যাদের জন্মকালীন ওজন ২ হাজার ৫০০ গ্রামের নিচে বা গর্ভকাল ৩৭ সপ্তাহের কম।
হার্টের জন্মগত রোগ মূলত দুই রকম—সায়ানোটিক ও এসায়ানোটিক। সায়ানোটিক গ্রুপের মধ্যে ‘ফেলটস টেট্রালজি’ বেশি দেখা যায়, যেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে শিশুর শরীর নীল হয়ে যায়। এসায়ানোটিক কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজে শিশুর শরীরে নীলবর্ণ ভাব থাকে না। এই শিশুরা ঘনঘন সর্দিকাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়।
এসায়ানোটিক হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত শিশুরা বুকের দুধ একনাগাড়ে টানতে পারে না। তারা একটু টেনেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও ঘুমিয়ে যায়। পেট না ভরার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই জেগে উঠে কাঁদতে থাকে এবং অত্যধিক ঘামে। এসব শিশুর ঠিকমতো বৃদ্ধি হয় না এবং তারা বারবার অসুস্থ হয়। বেশিরভাগ হার্টের জন্মগত ত্রুটি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসায় সারিয়ে তোলা সম্ভব।



মতামত (0)