আজকের আধুনিক যুগে শিক্ষা বলতে শ্রেণিকক্ষ, নির্দিষ্ট সিলেবাস, সেমিস্টারভিত্তিক পরীক্ষা, জিপিএ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিকে বোঝানো হয়। তবে মধ্যযুগের ইসলামি স্বর্ণযুগে শিক্ষাব্যবস্থা এমন যান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ ছিল না। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর বহু শতাব্দী আগেই মুসলিম বিশ্বে এক অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। মসজিদ ও তার পাঠচক্র, প্রাথমিক মক্তব এবং উলামাদের ব্যক্তিগত পাঠশালা থেকে শুরু করে ওয়াকফভিত্তিক সুবিশাল মাদ্রাসাগুলোতে জ্ঞানচর্চা চলত।
প্রাচীন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা একটি ভিন্ন ধরনের নিয়ম মেনে চলত। এখানে শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু কোনো দেয়ালঘেরা ভবন ছিল না, বরং কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন শিক্ষক। আলিম বা শাইখ, নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় গ্রন্থ এবং সরাসরি শিক্ষক-ছাত্রের নিবিড় সান্নিধ্যের মাধ্যমে অর্জিত স্বীকৃতি বা সনদ (ইজাজাহ) ছিল এই ব্যবস্থার ভিত্তি। একজন প্রজ্ঞাবান পণ্ডিতের পরিচয় নির্ধারিত হতো তিনি কতজন বিদগ্ধ শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং কতগুলো মৌলিক গ্রন্থ তাঁদের সামনে পড়ে শেষ করেছেন তার ওপর।
ইসলামের প্রাথমিক শতকগুলোতে শিক্ষকের ব্যক্তিত্বই বড় পাঠশালা হিসেবে গণ্য হতো। চার মাযহাবের ইমামদের জীবন এই ব্যবস্থার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। কুফার ইমাম আবু হানিফা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানের দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি কুফার প্রধান ফকিহ হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের পাঠচক্রে দীর্ঘ আঠারো বছর সার্বক্ষণিক সান্নিধ্যে থেকে ফিকহি ভিত নির্মাণ করেন।
মদিনার ইমাম মালিক ইবনে আনাস সাহাবি ও তাবেয়িদের জ্ঞানধারাকে ধারণ করে নিজস্ব পাঠচক্র গড়ে তোলেন। তাঁর রচিত হাদিস ও ফিকহের প্রাচীনতম সংকলন কেবল নিভৃতে পড়ার বই ছিল না। এটি ছিল মদিনার জ্ঞানপীঠে সরাসরি শিক্ষকের মুখে শ্রুত ও পর্যালোচিত এক জীবন্ত পাঠ্য। ইমাম শাফেয়ি জ্ঞানার্জনের জন্য দেশভ্রমণের এক অন্যতম প্রতীক ছিলেন।
মক্কায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি মদিনায় ইমাম মালিকের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ইরাকে গিয়ে হানাফি ঘরানার ফকিহদের থেকে জ্ঞান নেন। জীবনের শেষভাগে তিনি মিসরে গিয়ে তাঁর নতুন ফিকহি মাযহাবের পূর্ণতা দান করেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল হাদিস অনুসন্ধানে হেজাজ ও ইয়েমেনের পথে পথে ঘুরেছেন।
তিনি প্রবীণ মুহাদ্দিসদের মুখ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন। ইমাম শাফেয়ির নিকট থেকে তিনি ফিকহ ও উসূলের মূলনীতি আত্মস্থ করেন। জ্ঞানচর্চায় সব ধর্মের মানুষ বৃত্তি পেতেন। এটি সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।



মতামত (0)