ধর্মআল্লাহর নৈকট্য লাভে ৫ আমল
আল্লাহর নৈকট্য লাভে ৫ আমল
মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনে পাঁচটি আমল গুরুত্বপূর্ণ। ফরজ বিধানের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, নফল আমলের নিয়মিত চর্চা, ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত, সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকির এবং উত্তম চরিত্র ও সৃষ্টির সেবা এই আমলগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন একজন মুমিনের জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। মানুষ আল্লাহকে যত বেশি স্মরণ করে, তাঁর আনুগত্যে নিজেকে সঁপে দেয় এবং তাঁর প্রিয় কাজগুলোয় আত্মনিয়োগ করে, সে ততই তাঁর রবের নিকটবর্তী হতে থাকে। ইসলামি জীবনবিধানে সব আমলের গুরুত্ব ও মর্যাদা এক স্তরের নয়। শরিয়তে কিছু সুনির্দিষ্ট আমল ও কর্মপন্থা রয়েছে, যা বান্দাকে দ্রুত আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসার পরম সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়।
আমলের পর্যালোচনার আগে ‘আল্লাহর নৈকট্য’ বা ‘কুরবে ইলাহি’-র তাৎপর্য বোঝা জরুরি। আল্লাহর নৈকট্য কোনো স্থানিক বা ভৌগোলিক নৈকট্য নয়। মহান আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট স্থান, দিক বা সীমানার মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। ইসলামি আকিদার দৃষ্টিতে বান্দার আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ হলো, বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত, ভালোবাসা ও বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ পাওয়া। এর মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা আল্লাহর দরবারে সুউচ্চ হয়।
আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার পথের প্রথম এবং অলঙ্ঘনীয় ধাপ হলো তাঁর নির্ধারিত ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে আদায় করা। একটি ‘হাদিসে কুদসি’তে মহান আল্লাহ–তাআলা নৈকট্য লাভের এই প্রাথমিক ভিত্তি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার বান্দা আমার নৈকট্য লাভের জন্য যা কিছু করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, সামর্থ্যবানদের জন্য জাকাত ও হজ এবং শরিয়তের যাবতীয় হারাম বিষয় থেকে বেঁচে থাকা ইমানের মেরুদণ্ড। কোনো ব্যক্তি যদি ফরজ আমলগুলোয় অবহেলা করে শুধু নফল বা অন্যান্য বাহ্যিক আমলে মগ্ন থাকে, তবে তা দিয়ে কখনোই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। ফরজ হলো ভবনের মূল ভিত্তির মতো; ভিত্তি মজবুত না হলে ওপরের কোনো কাঠামোরই স্থায়িত্ব থাকে না।
ফরজ বিধানগুলো সতর্কতার সঙ্গে পালন করার পর বান্দাকে আল্লাহর একান্ত প্রিয় বানায় ঐচ্ছিক বা নফল ইবাদত। উপরিউক্ত হাদিসে কুদসিতেই মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘এবং আমার বান্দা ক্রমাগত নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে—যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)। নামাজের মধ্যে সেজদা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে কার্যকর ও চূড়ান্ত মুহূর্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা সিজদাহরত অবস্থাতেই তার মহান প্রতিপালকের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়; সুতরাং তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)। তাহাজ্জুদ নামাজ, চাশত-ইশরাকের নামাজ, নফল রোজা, দান-সদকা ও পবিত্র কোরআন পাঠ বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করে।
আমল কম হোক বা বেশি, আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার একমাত্র শর্ত হলো ‘ইখলাস’ বা খাঁটি নিয়ত। মানুষের চোখে অত্যন্ত চমৎকার ও বড় আমলও যদি লোকদেখানো (রিয়া), প্রশংসা কুড়ানো বা পার্থিব স্বার্থের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে আল্লাহর দরবারে তার কোনো মূল্য থাকে না। বরং তা শিরকে আসগার বা গোপন পাপে পরিণত হয়। আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি অন্তরের পরিচ্ছন্নতার সফর। প্রতিটি আমলের শুরুতে ও শেষে হৃদয়কে এই বিশ্বাসে স্থির রাখতে হবে যে, এই কাজ কেবল রবের সন্তুষ্টির জন্যই নিবেদিত।
বান্দা ও স্রষ্টার মধ্যকার অদৃশ্য সেতুবন্ধন হলো আল্লাহর জিকির। আল্লাহ–তাআলা কোরআনে এক পরম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)। জিকির মানুষের অন্তরকে জীবন্ত ও সতেজ রাখে। প্রাত্যহিক শত ব্যস্ততার মধ্যেও যার জিহ্বা আল্লাহর তাসবিহ, তাহমিদ ও ইস্তিগফারে সিক্ত থাকে এবং যার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি জাগ্রত থাকে, সে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।
ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর নৈকট্য কেবল জায়নামাজ কিংবা মসজিদের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ, সত্যভাষণ, পিতা-মাতার নিঃস্বার্থ সেবা, আত্মীয়দের খোঁজখবর রাখা, আমানত রক্ষা এবং সততার সঙ্গে হালাল উপার্জন করাও মহান রবের নৈকট্য পাওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৫৭৮৭)।
মতামত (0)