ধর্মহজের অর্থের যাকাত: এজেন্সি ও ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের বিধান
হজের অর্থের যাকাত: এজেন্সি ও ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের বিধান
হজের জন্য এজেন্সিকে দেওয়া টাকার যাকাত হজযাত্রীকে দিতে হয় না, তবে ব্যক্তিগতভাবে সঞ্চিত অর্থের ওপর নির্দিষ্ট শর্তে যাকাত প্রযোজ্য হয়।
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম হলো পবিত্র হজ, যা শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রতিটি মুসলমানের ওপর জীবনে একবার পালন করা ফরজ। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত পালনে অবহেলা করাকে ইসলামে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পবিত্র মক্কায় সমবেত হন এবং 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' ধ্বনিতে কাবা প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তোলেন।
হজ পালনের প্রস্তুতি হিসেবে অনেক মুসলমান দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ সঞ্চয় করেন, যা নিয়ে যাকাত সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন প্রায়শই উত্থাপিত হয়। এই সঞ্চিত অর্থ যখন যাকাতের নেসাব পরিমাণ হয় এবং তার ওপর এক বছর পূর্ণ হয়, তখন এর ওপর যাকাত দিতে হবে কি না, তা একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা। একইভাবে, হজের খরচ বাবদ কোনো ট্রাভেল এজেন্সিকে টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার পর ওই অর্থের যাকাত আদায়ের দায়িত্ব হজযাত্রীর ওপর বর্তাবে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, হজের খরচ এবং এজেন্সির ফি হিসেবে যে অর্থ একজন হজযাত্রী ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে পরিশোধ করে দিয়েছেন, সেই অর্থের ওপর তাকে যাকাত দিতে হবে না। এই অর্থ এজেন্সিকে হস্তান্তরের পর তা আর হজযাত্রীর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন থাকে না, ফলে যাকাত আদায়ের মূল শর্ত – অর্থের ওপর পূর্ণ মালিকানা – এখানে প্রযোজ্য হয় না। তাই, মালিকানা হস্তান্তরের পর ওই অর্থের যাকাত আদায়ের দায়িত্ব হজযাত্রীর ওপর বর্তায় না, যা শরিয়তের একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
তবে, যদি কোনো ব্যক্তি ভবিষ্যতে হজ পালনের উদ্দেশ্যে নিজের কাছে অর্থ সঞ্চয় করে রাখেন এবং সেই অর্থ তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হবে। এই সঞ্চিত অর্থ যদি যাকাতের নেসাব পরিমাণ হয় এবং তার ওপর একটি পূর্ণ চান্দ্র বছর অতিবাহিত হয়, তবে সেই অর্থের যাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে, অর্থ যেহেতু ব্যক্তির সম্পূর্ণ মালিকানাধীন থাকে এবং তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই এর ওপর যাকাত ফরজ হয় এবং তাকে তা আদায় করতে হয়।
যাকাতের এই বিধান মূলত অর্থের মালিকানার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে এজেন্সিকে পরিশোধিত অর্থের আইনি ও ব্যবহারিক মালিকানা এজেন্সির কাছে চলে যায় এবং হজযাত্রী সেই অর্থের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারান। কিন্তু নিজের কাছে রাখা হজের টাকা ব্যক্তির সম্পূর্ণ মালিকানাধীন থাকে এবং এই অর্থের বৃদ্ধি বা সংরক্ষণের দায়িত্বও তার নিজের। এই মৌলিক পার্থক্যের কারণেই উভয় ক্ষেত্রে যাকাতের বিধান ভিন্ন হয়ে থাকে, যা ইসলামী ফিকহ দ্বারা সমর্থিত।
ইসলামী শরিয়তের বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থ এই বিধানের সমর্থন করে এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করে, যার মধ্যে আলজামিউল কাবীর (পৃ. ২৫), খিযানাতুল আকমাল (১/২৬৩), শরহুল জামিইল কাবীর, আত্তাবী (১/৩৪৬-৩৪৬), আলবাহরুর রায়েক (২/২০৩) এবং রদ্দুল মুহতার (২/২৬২) উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থগুলো ইসলামিক ফিকহ ও মাসআলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
মতামত (0)