আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মানদণ্ড নিয়ে এইচআরডব্লিউর গুরুতর উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মানদণ্ড নিয়ে এইচআরডব্লিউর গুরুতর উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মানদণ্ড নিয়ে এইচআরডব্লিউর গুরুতর উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। | প্রথম আলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ এইচআরডব্লিউর আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৬: ১৭ এইচআরডব্লিউ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক অপর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), যা বাংলাদেশের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে তুলে ধরেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক এই সংস্থাটি তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই ব্যর্থতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করে তুলতে পারে। তাদের মতে, এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ করার এবং অতীতের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এই উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা গত ২৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছেন। এইচআরডব্লিউর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং এমনকি সাংবাদিকেরাও রয়েছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর তাৎপর্য বহন করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এই পরিস্থিতিতে মন্তব্য করেছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তবে তিনি একইসাথে জোর দিয়ে বলেছেন যে, অনেককে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় থাকছে না। তার এই বক্তব্য বিচারপ্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী আরও উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের জরুরিভাবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সংস্কার করা প্রয়োজন। তিনি নতুন সরকারের কাছে এই নিশ্চয়তা চেয়েছেন যেন ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও ইচ্ছামাফিক আনা অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ না থাকে। এটি বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনা সম্পর্কিত বিভিন্ন মামলার শুনানি চলছে। ওই আন্দোলনে ৮০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং কয়েক হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। এর পাশাপাশি হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনারও বিচার চলছে ট্রাইব্যুনালে, যা জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম চলা এক ডজনের বেশি মামলা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের পর্যবেক্ষণে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যখন স্থানীয় এই ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক আইনের অধীন গুরুতর অপরাধের বিচার করছে। প্রসিকিউটররা সাক্ষীদের জবানবন্দির ওপর নির্ভর করে অনেক অপরাধের অভিযোগে ও মামলায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটক ও অভিযুক্ত করছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে একই অপরাধের বর্ণনা একাধিক জবানবন্দিতে হুবহু বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ‘কাট-পেস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি বিচার শেষ করেছেন, যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে তাঁদের অনুপস্থিতিতে, যা আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডে অভিযুক্তদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই বিচারগুলোতে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছে, যা শাস্তির কঠোরতা ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তাকারী ব্যক্তিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন হাসিনা সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। সে সময় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়। তবে তথ্যপ্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের মধ্যে যোগসাজশ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি সুরক্ষা না থাকা নিয়ে ওই বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল।

২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীরা হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসংক্রান্ত আইন সংশোধন করে। এই সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা। তবে এইচআরডব্লিউ বলেছে, এসব সংশোধন হওয়া সত্ত্বেও যেসব আন্তর্জাতিক আদালতে এ ধরনের অপরাধের বিচার করা হয়, সেগুলোর তুলনায় ট্রাইব্যুনালের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার এই আইনে আর কোনো সংশোধনী আনেনি। এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, যে আইনে ট্রাইব্যুনাল পরিচালিত হচ্ছে, তাতে এখনো প্রসিকিউটরদের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ, আটকের কারণ লিখিতভাবে জানানো ছাড়াই মাসের পর মাস আটকে রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি মৌলিক মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে মানবাধিকার সংস্থাটি মনে করে।

এছাড়া, আইনে পৃথক কোনো আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আপিল (ইন্টারলোকেটরি আপিল) করার অধিকারও দেওয়া হয়নি, যা বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের সুযোগ সীমিত করে। প্রসিকিউশন তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ করার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে বিচারকাজ শুরু করা যায়, যা আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির জন্য সময় খুবই কম হয় বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে। আসামির অনুপস্থিতিতে যে বিচার করা হচ্ছে, সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের অধিকারসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাকবচ নেই, যা সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরার সুযোগও ট্রাইব্যুনাল সীমিত করে দিয়েছেন, যা সাক্ষ্যপ্রমাণের সত্যতা যাচাইয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সম্প্রতি গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদন করার কারণে তাঁদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। সে সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার কথা মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানালেও প্রসিকিউটররা তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন।

এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে তারা এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। চিফ প্রসিকিউটরের মতে, এই প্রতিবেদন কিছু আসামির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে এবং বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই এটি প্রকাশ করা হয়েছে, যা দুঃখজনক।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এখন নতুন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ এবং চিফ প্রসিকিউটরের পাল্টা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল ভুক্তভোগীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...