বিনোদন

আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের বহুমুখী জীবন: বডিবিল্ডিং থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর

আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের বহুমুখী জীবন: বডিবিল্ডিং থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর
আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের বহুমুখী জীবন: বডিবিল্ডিং থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর
আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার ৭৯ বছর বয়সেও তার বহুমুখী জীবন নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন, যেখানে তিনি বডিবিল্ডিং, হলিউড ও রাজনীতিতে সাফল্য অর্জন করেছেন।

আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার সম্প্রতি ৭৯ বছর পূর্ণ করেছেন। তিনি তার জীবনে শরীর গঠন প্রতিযোগিতা, হলিউড ও মার্কিন রাজনীতি—এই তিনটি ভিন্ন জগৎ জয় করেছেন। তার এমন বহুমুখী সাফল্য বিশ্বে বিরল। তাকে অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং নিজেকে বারবার নতুনভাবে গড়ে তোলার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

১৯৪৭ সালের ৩০ জুলাই অস্ট্রিয়ার থাল নামের এক ছোট শহরে শোয়ার্জেনেগারের জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে তার শৈশব কেটেছে। তার বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং পরিবারে কঠোর শাসন ছিল।

ছোটবেলা থেকেই শোয়ার্জেনেগারের বড় কিছু করার স্বপ্ন ছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি নিয়মিত ভারোত্তোলন ও শরীরচর্চা শুরু করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শরীর গঠনই তাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে পারে। তার শৈশব সহজ ছিল না।

শোয়ার্জেনেগার জানিয়েছেন, তার বাবা কঠোর স্বভাবের ছিলেন। একই পরিবেশে বড় হওয়া তার ভাই মেইনহার্ড মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং পরে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। আর্নল্ডের ক্ষেত্রে সেই কঠোর বাস্তবতা ভিন্ন প্রভাব ফেলেছিল।

শোয়ার্জেনেগার বলেন, “যা আমার ভাইকে ভেঙে দিয়েছে, সেটাই আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে।” তিনি ১৮ বছর বয়সে অস্ট্রিয়া ছেড়ে চলে আসেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার বাবার মতো জীবন তিনি কখনোই বেছে নেবেন না।

২০ বছর বয়সে শোয়ার্জেনেগার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ মিস্টার ইউনিভার্স খেতাব জেতেন। এরপর তিনি একের পর এক শিরোপা জিতে সাতবার মিস্টার অলিম্পিয়া হন। এর মাধ্যমে তিনি বডিবিল্ডিংয়ের ইতিহাসে কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করেন।

বিশাল দেহ, নিখুঁত পেশি এবং আত্মবিশ্বাসের কারণে শোয়ার্জেনেগার দ্রুত বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। আধুনিক বডিবিল্ডিংয়ে আজও তার প্রভাব অটুট রয়েছে।

সাতবার মিস্টার অলিম্পিয়া জেতার পাশাপাশি শোয়ার্জেনেগার বহু বই লিখেছেন। তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষকে স্বাস্থ্য ও ব্যায়াম সম্পর্কে নিয়মিত উৎসাহ দেন।

জীবনের শুরুতে তিনি ইট বহন ও নির্মাণকাজও করেছেন। নিজের উচ্চারণকে তিনি দুর্বলতা না ভেবে পরিচয়ের অংশে পরিণত করেছেন। তিনি বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত।

বডিবিল্ডিংয়ে সাফল্যের পর শোয়ার্জেনেগার যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন। হলিউডে এসে তিনি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। প্রযোজকদের অভিযোগ ছিল, তার উচ্চারণ খুব ভারী, নাম উচ্চারণ করা কঠিন এবং শরীর ‘অতিরিক্ত বড়’।

অনেকেই বলেছিলেন, তিনি কখনোই বড় অভিনেতা হতে পারবেন না। কিন্তু শোয়ার্জেনেগার হাল ছাড়েননি। তিনি ইংরেজি শিখেছেন, অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

১৯৮৪ সালে ‘দ্য টার্মিনেটর’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই ছবিতে মাত্র কয়েকটি সংলাপ থাকলেও শোয়ার্জেনেগারের বলা ‘আই উইল বি ব্যাক’ চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত সংলাপে পরিণত হয়।

এরপর শোয়ার্জেনেগারকে আর থামানো যায়নি। ‘টার্মিনেটর ২’, ‘প্রিডেটর’, ‘কমান্ডো’, ‘টোটাল রিকল’, ‘ট্রু লাইস’, ‘কনান দ্য বারবারিয়ান’, ‘কিন্ডারগার্টেন কপ’—এমন একটার পর একটা ছবি তাকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাকশন তারকায় পরিণত করে।

অনেকেই মনে করেন, শোয়ার্জেনেগারের সব সম্পদ অভিনয় থেকে এসেছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিনি রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করেন।

পরে বিভিন্ন ব্যবসা, বিনিয়োগ, বই, বিজ্ঞাপন, প্রযোজনা এবং ফিটনেস-সম্পর্কিত উদ্যোগ থেকে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের মালিক। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, অভিনয়ের আগেই শোয়ার্জেনেগার কোটিপতি হওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।

২০০৩ সালে শোয়ার্জেনেগার রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচিত হন। পরে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদেও দায়িত্ব পালন করেন। হলিউডের জনপ্রিয় নায়ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হওয়া তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ক্ষমতায় থাকাকালে পরিবেশ, অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শোয়ার্জেনেগারের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়।

১৯৮৬ সালে শোয়ার্জেনেগার সাংবাদিক মারিয়া শ্রিভারকে বিয়ে করেন। তাদের চার সন্তান রয়েছে। তবে ২০১১ সালে প্রকাশ পায়, বহু বছর আগে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে তার একটি সন্তানের জন্ম হয়েছিল।

এই ঘটনা সামনে আসার পর তাদের দাম্পত্য জীবনে ভাঙন ধরে। দীর্ঘ বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি ঘটে। শোয়ার্জেনেগার স্বীকার করেন, সেই বিচ্ছেদের জন্য তিনিই দায়ী। তার কথায়, “বিবাহবিচ্ছেদ কীভাবে সামলাতে হয়, তার জন্য যদি কোনো পুরস্কার থাকত, তাহলে আমি আর মারিয়া সেটি পেতাম।”

হৃদ্‌যন্ত্রের জন্মগত সমস্যার কারণে জীবনে একাধিকবার বড় অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে শোয়ার্জেনেগারকে। বয়স বাড়লেও তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা, সাইকেল চালানো, ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এখনো তার দৈনন্দিন অভ্যাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি তরুণদের ব্যায়াম ও সুস্থ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...