আন্তর্জাতিকবাংলাদেশের সার্বিক সংস্কারে ইউএনডিপির পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস
বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কারে ইউএনডিপির পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস
ইউএনডিপি বাংলাদেশের আইনি, বিচারিক, নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক সংস্কারসহ সার্বিক প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এই ঘোষণা ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এক বৈঠকে দেন।
জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দেশের আইনি, বিচারিক, নিরাপত্তা খাত এবং সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেজ মঙ্গলবার সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে এই সহযোগিতার কথা জানান।
সাক্ষাৎটি বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সাংবিধানিক সংস্কার, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা এবং পুলিশের সামর্থ্য বৃদ্ধি ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়।
এছাড়াও বৈঠকে গুজব ও অপতথ্য রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে কথা হয়। প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় স্থান পায়।
ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেজ বৈঠকে বলেন, "আমরা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে চাই।" তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান এবং সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি মনোনীত হওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করেন। রড্রিগেজ জানান, মন্ত্রী চাইলে ইউএনডিপি এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে আগ্রহী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউএনডিপির ধারাবাহিক সহায়তার প্রশংসা করেন। তিনি ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান।
বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) জন্য ইউএনডিপির সহায়তার বিষয়ে আবাসিক প্রতিনিধি তথ্য দেন। তিনি জানান, ক্যাম্প এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা যেমন পাহাড় ধস প্রতিরোধ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ইউএনডিপি কাজ করছে। এর উদ্দেশ্য হলো ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
এই প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, "আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান অবকাঠামোর যথোপযুক্ত উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন চাই।" তবে বৃহত্তর স্বার্থে সেখানে নতুন করে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে চান না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইউএনডিপি বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। আবাসিক প্রতিনিধি জানান, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ, সংঘাত ও বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানা বিষয়ে ইউএনডিপি প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। মন্ত্রীও এ সময় পুলিশের দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিতে ইউএনডিপির সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধ প্রসঙ্গে আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, "বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন গুজব, অপতথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে।" তিনি জানান, এগুলো কার্যকরভাবে রোধে ইউএনডিপি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করছে। এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে চান তারা, যাতে কোনো লঙ্ঘন ঘটলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়।
মন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, "সাইবার সুরক্ষা আইন ইতোমধ্যে পাস হয়েছে।" তিনি পরামর্শ দেন যে ইউএনডিপি এ আইনের সফল বাস্তবায়নে লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে পারে।
প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন আইন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, "জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬"-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। তিনি আশা করেন, জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে এটি পাস হবে। আইনটি প্রণয়নে ইউএনডিপি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশী মিশন, উন্নয়ন অংশীদার, পত্রিকার সম্পাদক ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, দেশের সামাজিক মনস্তত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতিকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। আশা করা হয়, এটি একটি যুগোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য আইন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
বৈঠকে মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। এ সময় তিনি নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, "গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬"-এর খসড়াও মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন লাভ করেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন আবাসিক প্রতিনিধি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সবসময় বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ একটি উদার ও ধর্মীয় সহনশীল দেশ। ইউএনডিপি এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি বাস্তবায়নেও কাজ করতে আগ্রহী।
সাক্ষাৎকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পার্টনারশিপ সাপোর্ট স্পেশালিস্ট সাইফ ইসলামও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
মতামত (0)