অস্বাভাবিক গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের আটটি প্রধান নগরে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে তাপমাত্রা বাড়ছে, যা জীবনযাপন ও জীবিকার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আজ ৬ আশ্বিন, রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে জনজীবন অস্থির হয়ে উঠেছে। শেরেবাংলা নগর এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ অস্বস্তিতে পড়েছেন।
ভাদ্র মাসের শেষের দিকে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দক্ষিণ গোবিন্দী গ্রামের নারীরা তীব্র গরমের কথা জানিয়েছেন। সামিনা বেগম, বিলকিস খাতুন ও শেফালী বেগমদের মতে, এমন গরম তারা আগে কখনো অনুভব করেননি। বিলকিস খাতুনের স্বামী আগের দিন খেতে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
সামিনা বেগম জানান, তার ১২ হাজার টাকা দিয়ে কেনা দুটি বকরি চার-পাঁচ দিন আগে পাতলা পায়খানায় মারা গেছে। আরেক নারী শেফালী বেগম বলেছেন, তার মনে হয় বাংলাদেশ এখন দুই ঋতুর দেশে পরিণত হয়েছে; যখন শীত হয়, তখন এত শীত থাকে যে কাজ করা কঠিন, আবার যখন গরম পড়ে, তখন মাঠে গেলে স্ট্রোক করে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। তবে গ্রামের কৃষকদের এসব অভিজ্ঞতাভিত্তিক ধারণা, চিকিৎসা বা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং দূষণের সম্মিলিত প্রভাবে অস্বস্তি বাড়ছে। এর ফলে মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলাচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ও জীবিকার ঝুঁকিও বাড়ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ঢাকাসহ দেশের বড় নগরগুলোর ৪৪ বছরের (১৯৮১ থেকে ২০২৫) তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তীকালে প্রতিটি নগরীর তাপমাত্রা বাড়ছে। জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে টানা চার বছর ধরে তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। বাংলা পঞ্জিকায় শরৎকাল হলেও আবহাওয়ার হিসাবে এটি মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের সময়।
গত মঙ্গলবার ঢাকাসহ দেশের ২৫ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এর পরদিনও পাঁচটি জেলায় তাপপ্রবাহ ছিল। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা সেপ্টেম্বরে তাপপ্রবাহের সীমা ছুঁয়েছে। গত ২০ বছরে এ মাসে টানা চার বছর তাপপ্রবাহের এমন নজির নেই।
২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুরে তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটে ৩৮ ডিগ্রি এবং ঢাকায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এসব তথ্য সেপ্টেম্বরে ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার ইঙ্গিত দেয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের যৌথ গবেষণা আটটি নগরের (ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম) তাপমাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণার সবচেয়ে অভিন্ন ফল পাওয়া গেছে বর্ষাকালে। এ সময় সাতটি নগরেই দিন ও রাতের তাপমাত্রা বেড়েছে।
বর্ষাকালে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রবণতা দেখা গেছে রাজশাহীতে, যেখানে প্রতি দশকে দিনের তাপমাত্রা ০.৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। এটি রাজশাহী শহরের শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী এই চার ঋতুর মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রবণতা। এরপর বর্ষায় দিনের তাপমাত্রা প্রতি দশকে সিলেটে ০.৪৫, খুলনায় ০.৩৮, বরিশালে ০.৩৭, রংপুরে ০.৩৪, ঢাকায় ০.৩৩ এবং ময়মনসিংহে ০.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে।
বর্ষাকালে আটটি নগরেই রাতের তাপমাত্রা বেড়েছে। চট্টগ্রামে প্রতি দশকে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ০.২৯, সিলেট ও বরিশালে ০.২৮, রাজশাহীতে ০.২৩, ঢাকায় ০.১৬ এবং ময়মনসিংহে ০.০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। দিনের গরমের পর রাতে নগরগুলোর স্বাভাবিকভাবে শীতল হওয়ার সুযোগও কমছে।
বর্ষা-পরবর্তী সময়েও অধিকাংশ নগরে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। এই সময়ে দিনের তাপমাত্রা সিলেটে প্রতি দশকে ০.৩৬, রংপুরে ০.২৬, খুলনায় ০.২৬, রাজশাহীতে ০.২২ এবং বরিশালে ০.১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকায় ০.১৪ এবং চট্টগ্রামে প্রতি দশকে ০.১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে ময়মনসিংহে এ বৃদ্ধি খুব তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
বর্ষা-পরবর্তী সময়ে রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র আরও স্পষ্ট। তাপমাত্রা সিলেটে প্রতি দশকে ০.৪০, রংপুরে ০.৩৬, ঢাকায় ০.২৯, চট্টগ্রামে ০.২৮, খুলনায় ০.২৪ এবং বরিশালে ০.২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। রাজশাহীতেও রাতের তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে।
মতামত (0)