বিনোদন

ভয়

ভয়
ভয়
আহমেদ খান হীরকের গল্প সকালটা হব হব করছে। কিন্তু এর মধ্যেই পুরো বিছানা ভিজে গেছে ঘামে। এমনকি বালিশটাও। ফুল স্পিডে ফ্যান চালিয়েও ঘরের ভেতর ঘামছি। ভাইয়ার রুমে এসি আছে, ওখানে যাব কি যাব না ভাবছি, এমন সময়

ভোর হওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, কিন্তু এরই মধ্যে পুরো বিছানা ঘামে ভিজে গিয়েছিল। বালিশও ভেজা ছিল। ঘরের ভেতর ফ্যান পূর্ণ গতিতে চললেও ঘাম থামছিল না।

এই সময়ে জানালায় একটি টোকা শোনা যায়, সাথে একটি কণ্ঠস্বর ‘রবিন! রবিন!!’ কণ্ঠস্বরটি সাদ্দাম হোসেনের বলে জানা যায়। এই কণ্ঠ এবং পরিস্থিতি শুনে মনে ভয় জাগে।

কণ্ঠস্বরটি তার দাদুর শৈশবের গল্পের সঙ্গে মিলে যায়। দাদু তার কৈশোরের লুঙ্গি পরা জীবনের অনেক গল্প শোনাতেন, যেখানে রহস্য ও ভয় মেশানো থাকত। জানালা খুলতে যাওয়া মানেই দাদুর ভাষায় এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনা।

দাদু এক সময় পাগলা নদীর পাড়ে বাস করতেন। সেই নদী নাকি এক লাফে পার হওয়া যেত, আর পার হলেই যাওয়া যেত এক ভিন্ন দেশে। সেখানে ছিল অসংখ্য ফুলের বাগান, লাল, কমলা, হলুদ ফুলে ভরা।

বাগানের মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ত, যা দেখতে খুবই সুন্দর ছিল। কিন্তু দাদু সতর্ক করতেন, এসব দেখে মুগ্ধ হলেই নাকি বিপদ। তিনি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতেন, যদি কেউ পাগলা নদীর ওপারের মাধুর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে আফসোস করে বলে ফেলে, ‘আহারে, পারতাম যদি ওইখানে যেতে,’ তাহলেই নাকি সর্বনাশ।

তখন ভোলারা সেই কথা শুনে ফেলে, আর তাতেই সব শেষ হয়ে যায়। ‘ভোলারা’ হলো বহুবচন, আর ‘ভোলা’ হলো একবচন। তারা অশরীরী সত্তা, বাতাসে মিশে থাকে, ছায়ার সাথে মিলে থাকে।

তারা যে কারও চেহারা নিতে পারে। মাছের শরীরে ঢুকে যেতে পারে, এমনকি ভ্যা ভ্যা ডাক ছাড়া করুণ ছাগলও হয়ে যেতে পারে। ছাগল হয়ে গেলে মানুষ তাকে কেটে খেয়ে ফেলবে, এমন প্রশ্নে দাদু ফোকলা দাঁতে হাসতেন।

তিনি চশমা খুলে পাঞ্জাবি দিয়ে মুছে বলতেন, তার চেয়েও ভয়ানক ব্যাপার হলো, ভোলারা মানুষ হয়ে যেতে পারে। ১৬ বছর বয়সী নাতির মনে এতে অবিশ্বাস হয়, কারণ মানুষ হওয়া অত সহজ নয়।

দাদু তখন জোর দিয়ে বলতেন, তার গল্প শতভাগ খাঁটি। তিনি বুঝিয়েছিলেন, এই দুনিয়ায় শরীরের সঙ্গেই অশরীর, কায়ার সঙ্গেই ছায়া, আর আলোর মধ্যেই অন্ধকার থাকে। এই ভুবনের সঙ্গেই থাকে আমাদের অজানা অন্য এক ভুবন, আর সেই ভুবনের বাসিন্দা হলো এই ভোলারা।

দাদু তার শৈশবের গল্প বলতে শুরু করেন। পাগলা নদীর নাম কে রেখেছিল তা জানা নেই, কারণ নদীটি এত সরু ছিল যে তাতে পাগলামি বা দুরন্তপনা কিছুই ছিল না। দাদুর শৈশব কেটেছিল এই নদীর পাড়েই।

তখন তাদের তোমাদের মতো বাহারি প্যান্ট-শার্ট-গেঞ্জি ছিল না। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় তাদের হাইস্কুলের খাকি প্যান্ট আর সাদা শার্ট ছিল। বাকি সময়ে সবার পরনে থাকত লুঙ্গি, গা খালি।

লুঙ্গি কাছা মেরে তারা কাদার ভেতর হাত দিয়ে কই মাছ ধরতেন। কই মাছের কাঁটা খুবই বিষাক্ত ছিল, যা আঙুলে বিঁধলে রাত পার হলেও ব্যথা দূর হতো না। এসব ব্যথা বা কাঁটার ওষুধের জন্য তারা আকন্দ গাছের রস ব্যবহার করতেন।

আকন্দ গাছের গোল বড় বড় পাতা ছিঁড়লে ঘন দুধসাদা আঠালো রস বের হতো। সেই রস ঘায়ে বা যেকোনো ক্ষততে লাগালে ঘা সেরে যেত, ক্ষত শুকিয়ে যেত। পাগলা নদীর এপার আকন্দ গাছে ছেয়ে ছিল।

হাত-পা কাটলে বা কই-শিংয়ের কাঁটা বিঁধলে তারা গাছের কাছে ছুটে যেতেন। অথচ তাদের পা দুটি ছুটে যেতে চাইত নদীর ওপারে। কী আছে ওপারে, এ প্রশ্ন না করে বলা যেত, কী নেই ওপারে!

পাগলা নদী এক লাফের সমান ছিল, যা পেরোতে গলাও ভিজত না। অথচ এই নদী পেরোনো যেত না। এপারের নিষেধ ছিল ওপারে যেতে, কারণ ওপার নাকি পিশাচপুরী।

দাদু ব্যাখ্যা করেন, পিশাচরা জম্বির মতো কিছু। তারা মরে গিয়েও মরে না, বেঁচে থেকেও বেঁচে থাকে না, সিনেমার মতো মারকাটারি করে। তাদের সময়ে জম্বি বা ড্রাকুলার ছবি বা সিনেমা ছিল না, যা ছিল সব আসল।

আসল দৈত্য, আসল দানো, আসল শাঁকচুন্নি, আসল পিশাচ ছিল। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ভোলা, যার নাম এখনকার মানুষ শোনেনি। ভোলার নিজস্ব কোনো আকার বা আকৃতি ছিল না।

তবে কোনো কোনো রাতে তাদের দেখা যেত অনেক দূরে, এক সার হয়ে কিছু আগুন চলে যেত। গ্রামের বড়রা তখন বলতেন, ‘ওই যে দেখো, ভোলা যাচ্ছে!’ বড়রা ভোলা দেখিয়েই ক্ষান্ত হতেন না।

তারা বারবার করে বলে দিতেন যেন পাগলা নদীর ওই পারে কখনোই না যায়। কিন্তু মানুষকে যা নিষেধ করা হয়, তাতে তার আগ্রহ বেশি থাকে, বিশেষ করে বয়স কম হলে। পাগলা নদীর এপারে মাছ ধরতে ধরতে দাদু এবং তার বন্ধু শহীদুল ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে থাকতেন ওপারের দিকে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...