ভোর হওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, কিন্তু এরই মধ্যে পুরো বিছানা ঘামে ভিজে গিয়েছিল। বালিশও ভেজা ছিল। ঘরের ভেতর ফ্যান পূর্ণ গতিতে চললেও ঘাম থামছিল না।
এই সময়ে জানালায় একটি টোকা শোনা যায়, সাথে একটি কণ্ঠস্বর ‘রবিন! রবিন!!’ কণ্ঠস্বরটি সাদ্দাম হোসেনের বলে জানা যায়। এই কণ্ঠ এবং পরিস্থিতি শুনে মনে ভয় জাগে।
কণ্ঠস্বরটি তার দাদুর শৈশবের গল্পের সঙ্গে মিলে যায়। দাদু তার কৈশোরের লুঙ্গি পরা জীবনের অনেক গল্প শোনাতেন, যেখানে রহস্য ও ভয় মেশানো থাকত। জানালা খুলতে যাওয়া মানেই দাদুর ভাষায় এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনা।
দাদু এক সময় পাগলা নদীর পাড়ে বাস করতেন। সেই নদী নাকি এক লাফে পার হওয়া যেত, আর পার হলেই যাওয়া যেত এক ভিন্ন দেশে। সেখানে ছিল অসংখ্য ফুলের বাগান, লাল, কমলা, হলুদ ফুলে ভরা।
বাগানের মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ত, যা দেখতে খুবই সুন্দর ছিল। কিন্তু দাদু সতর্ক করতেন, এসব দেখে মুগ্ধ হলেই নাকি বিপদ। তিনি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতেন, যদি কেউ পাগলা নদীর ওপারের মাধুর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে আফসোস করে বলে ফেলে, ‘আহারে, পারতাম যদি ওইখানে যেতে,’ তাহলেই নাকি সর্বনাশ।
তখন ভোলারা সেই কথা শুনে ফেলে, আর তাতেই সব শেষ হয়ে যায়। ‘ভোলারা’ হলো বহুবচন, আর ‘ভোলা’ হলো একবচন। তারা অশরীরী সত্তা, বাতাসে মিশে থাকে, ছায়ার সাথে মিলে থাকে।
তারা যে কারও চেহারা নিতে পারে। মাছের শরীরে ঢুকে যেতে পারে, এমনকি ভ্যা ভ্যা ডাক ছাড়া করুণ ছাগলও হয়ে যেতে পারে। ছাগল হয়ে গেলে মানুষ তাকে কেটে খেয়ে ফেলবে, এমন প্রশ্নে দাদু ফোকলা দাঁতে হাসতেন।
তিনি চশমা খুলে পাঞ্জাবি দিয়ে মুছে বলতেন, তার চেয়েও ভয়ানক ব্যাপার হলো, ভোলারা মানুষ হয়ে যেতে পারে। ১৬ বছর বয়সী নাতির মনে এতে অবিশ্বাস হয়, কারণ মানুষ হওয়া অত সহজ নয়।
দাদু তখন জোর দিয়ে বলতেন, তার গল্প শতভাগ খাঁটি। তিনি বুঝিয়েছিলেন, এই দুনিয়ায় শরীরের সঙ্গেই অশরীর, কায়ার সঙ্গেই ছায়া, আর আলোর মধ্যেই অন্ধকার থাকে। এই ভুবনের সঙ্গেই থাকে আমাদের অজানা অন্য এক ভুবন, আর সেই ভুবনের বাসিন্দা হলো এই ভোলারা।
দাদু তার শৈশবের গল্প বলতে শুরু করেন। পাগলা নদীর নাম কে রেখেছিল তা জানা নেই, কারণ নদীটি এত সরু ছিল যে তাতে পাগলামি বা দুরন্তপনা কিছুই ছিল না। দাদুর শৈশব কেটেছিল এই নদীর পাড়েই।



মতামত (0)