রাজনীতি

বিএনপি-এনসিপি সংঘাত: দূরত্ব বাড়াচ্ছে ক্ষমতার রাজনীতি ও কে এই বিভেদের কারিগর?

বিএনপি-এনসিপি সংঘাত: দূরত্ব বাড়াচ্ছে ক্ষমতার রাজনীতি ও কে এই বিভেদের কারিগর?
বিএনপি-এনসিপি সংঘাত: দূরত্ব বাড়াচ্ছে ক্ষমতার রাজনীতি ও কে এই বিভেদের কারিগর?
বিএনপি-এনসিপি দূরত্ব বাড়াচ্ছে কারা প্রিন্ট: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:২৪ পিএম দুই দলের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম যুগান্তর হোয়াটসঅ্যাপ ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের ভোটের রাজনীতিসহ নানারকম নিয়ন্ত্রণ প্রত

ক্ষমতার রাজনীতির জটিল সমীকরণে বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ক্রমেই বেড়ে চলা দূরত্ব এখন দেশের রাজনৈতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন এই বিভেদের পেছনের কারিগর কারা। স্থানীয় পর্যায়ের ভোটের রাজনীতি এবং বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য এই দ্বন্দ্বের আগুনে ঘি ঢালছে, আবার কোথাও মিছিল, পথসভা বা পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বে সরকারি দল বিএনপির নেতাকর্মীরা এনসিপির কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন।

গত দেড় বছরে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ১৮টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এনসিপির দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় এনসিপির ওপর বিএনপি নেতাকর্মীরাই হামলা চালিয়েছেন বলে তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও, বিএনপি এমন অভিযোগ মানতে নারাজ। সর্বশেষ হামলার ঘটনাটি ঘটেছে হবিগঞ্জে, যেখানে এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী কমবেশি আহত হন, ২-৩ জনের হাত-পা ভেঙে যাওয়াসহ একজনের চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এমনকি গণমাধ্যমকর্মী এবং ভাড়া করা মাইক্রোবাসের চালকও এই হামলা থেকে রেহাই পাননি।

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম হবিগঞ্জের এই হামলার জন্য সরাসরি স্থানীয় বিএনপি নেতা জিকে গউছের অনুসারী ছাত্রদল ও যুবদলকে দায়ী করেছেন। বুধবার যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন এবং যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিনও একই অভিযোগ করে বলেছেন, এনসিপি নেতারা জনগণের ভাষায় প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু বিএনপি তা সহ্য করার সক্ষমতা হারিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের চেয়েও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে জানিয়েছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে সভ্য ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করা উচিত; কুরুচিপূর্ণ ভাষা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধ না হলে জনগণ এর জবাব দেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলেও, প্রতিবাদের ভাষা প্রতিবাদী বক্তব্যের মধ্য দিয়েই হতে পারে, হামলা ও নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়নের চেষ্টার ঐতিহাসিক ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন, মাত্র দুই বছর আগে কী ঘটেছে এবং হাসিনা কীভাবে পালিয়েছেন, বিএনপি কি তা দেখেনি? তাঁর মতে, সেখান থেকে বিএনপির অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, স্থানীয় পর্যায়ের এসব সংঘাত-সহিংসতা রাজনীতির কেন্দ্রেও বড় আঘাত হানতে পারে, এবং এখনই সতর্ক না হলে তৃতীয় পক্ষ নিশ্চিত সুযোগ নেবে। জুলাই বিপ্লবে রাজপথের আন্দোলনের সতীর্থদের মধ্যে এ ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে তারা আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছেন।

গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারির সমন্বয়করা গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করার পর থেকেই এই দলের নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হয়ে আসছেন। গত বছর এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বরিশালে, ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে, জানুয়ারিতে নোয়াখালীর হাতিয়ায়, ৬ জুলাই সাভারে জুলাই পদযাত্রা শেষে সমাবেশে ককটেল হামলা এবং ১৯ জুলাই ফের হাতিয়ায় উল্লেখযোগ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার হবিগঞ্জের ঘটনাটি আগের সব মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা শেষে কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।

এনসিপির পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে, স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা এই সশস্ত্র হামলা চালিয়েছেন এবং সার্কিট হাউজের ভেতরে ঢুকে গাড়ি ভাঙচুর করেছেন। এ প্রসঙ্গে বুধবার বিকালে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন, বিএনপি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করছে এবং দলটির যুবদল-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছেন। তিনি হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় হামলা এবং এর আগে রংপুরের হারাগাছে সহিংসতার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়ী করে বলেছেন, বিএনপির যুব ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাকর্মীদের টার্গেট করে হামলা ও নির্যাতন চালাচ্ছেন।

আখতার হোসেন আরও উল্লেখ করেছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে জেলা-উপজেলায় এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হলেও কোনো একটি ঘটনারও বিচার তারা পাননি। পুলিশের সামনে মারধর-নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ক্রিয় থাকছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, বিএনপি এবং দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এনসিপির শীর্ষ নেতাসহ দলীয় নেতাদের ওপর বিভিন্ন সময় অতর্কিত হামলা চালানোর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন।

একইসাথে, এনসিপি ও বিএনপির মধ্যে এই টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়; ইশরাক হোসেনের মেয়র হওয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সামনে এনসিপির বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং পরবর্তীতে বিএনপি'র সমর্থন ঘোষণা দল দুটির মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তখন মনে করেছিলেন, ইশরাকের ইস্যুটিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করে বিএনপি মূলত এনসিপির সাথে তাদের শক্তির পরীক্ষা করছে। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নাকি জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এই ইস্যুতেও দুই দলের বিরোধী অবস্থান দেখা গেছে এবং সংস্কার প্রশ্নেও প্রকাশ্যে পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।

পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, এই সংঘাতময় পরিস্থিতি কেবল দুটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, এই ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সেই স্বপ্নকে ম্লান করে দিচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তবে এটি কেবল দুই দলের দূরত্বই বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

বিএনপি ও এনসিপির মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান দূরত্ব এবং সংঘাতের পেছনে ক্ষমতার রাজনীতি, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমানা নিয়ে ভিন্নমত কাজ করছে বলে প্রতীয়মান হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে সহিংসতা পরিহার করে গঠনমূলক সংলাপে ফেরা উভয় দলের জন্য জরুরি। অন্যথায়, এই আত্মঘাতী সংঘাত দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে তৃতীয় পক্ষের সুযোগ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...