রাজনীতি

বিএনপির নেতাকর্মীদের অপকর্মের লাগাম টানতে ব্যর্থ দল

বিএনপির নেতাকর্মীদের অপকর্মের লাগাম টানতে ব্যর্থ দল
বিএনপির নেতাকর্মীদের অপকর্মের লাগাম টানতে ব্যর্থ দল
দলীয় প্রধানের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও বিএনপির নেতাকর্মীদের অপকর্মের লাগাম টানা যাচ্ছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

দলীয় প্রধানের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও নেতাকর্মীদের অপকর্মের লাগাম টানতে পারছে না বিএনপি। বারবার দলের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও দলের কিছু নেতাকর্মী নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এসব ঘটনায় শো’কজ ও বহিষ্কার করা হলেও অভিযুক্তদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করা ত্যাগী কর্মীরা অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, দল ক্ষমতায় আসার পর কিছু "হাইব্রিড" বা সুযোগসন্ধানী নেতা দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করছে। তৃণমূল কর্মীরা এখন দল থেকে এই বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানের দাবি তুলছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৈরি করা এক তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে জমি দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িত ১৫৩০ জনের মধ্যে প্রায় ২৭৮ জন বর্তমান বা সাবেক বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর নাম এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলের নীতি-নির্ধারকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, জাতীয়তাবাদী আদর্শের কোনো প্রকৃত কর্মী চাঁদাবাজি বা দখলের মতো অপরাধে জড়াতে পারে না। দলের নাম ব্যবহার করে যারা অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পরদিনই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অভিযোগে ১ হাজার ২৩ জন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বৈশিষ্ট্য ভিন্ন।

এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন শুধু দলীয় শৃঙ্খলা নয়, দখল, চাঁদাবাজি, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহারের মতো অপরাধের অভিযোগও উঠে আসছে। ফলে দলীয় শুদ্ধি কার্যক্রম এবার কোন পর্যায়ে গিয়ে থামে, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, অপরাধী যেই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে গত কয়েকদিনে রাজধানীতে সন্ত্রাসী হামলা-মামলার আলোচিত ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দলের কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণ বিএনপির চেয়ারম্যানের হাতে পৌঁছায়। এরই ধারাবাহিকতায় শৃঙ্খলা ইস্যুতে কঠোর বার্তা দেন তারেক রহমান। সেই অনুযায়ী, গত বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

একই সময়ে বিলুপ্ত করা হয় উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও। বিএনপির পক্ষ থেকে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের কথাও জানানো হয়েছে। একই দিনে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের তিন নেতা—শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কুকে বহিষ্কার করা হয়।

ছাত্রদলের পাঁচ নেতা, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতা এবং শ্রমিক দলের চার নেতার বিরুদ্ধেও একই দিনে বহিষ্কারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে দলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে একটি বিষয় লক্ষণীয়। অভিযোগ উঠলেই সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।

কোথাও বহিষ্কার, কোথাও পদ স্থগিত, কোথাও কারণ দর্শানোর নোটিশ, আবার কোথাও তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। চেম্বার অব কমার্স কার্যালয় দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তিন নেতাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিযোগ যাচাই ও ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে পরবর্তী সিদ্ধান্তের পথ খোলা রাখা হয়েছে।

বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে সাংগঠনিক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণেও বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে ঘটনার সময়কে ঘিরে।

শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, সারাদেশের ঘটনাগুলোতেও অভিযোগের ধরনে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বরিশালের গৌরনদীতে ব্যবসায়ী এসএম জামিল হাসান মিঠুর কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে স্থানীয় বিএনপির তিন নেতা এসএম জাকির হোসেন, ফরহাদ শরীফ ও নাজমুল হাসান মিঠুকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গাজীপুরে পোশাক কারখানা থেকে চাঁদা দাবি ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকির অভিযোগে ফারুক খান ও আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই এলাকায় বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খুলনায়ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...