জাতীয়

চেরনোবিল বিপর্যয়: পারমাণবিক ইতিহাসের ভয়াবহ রাত

চেরনোবিল বিপর্যয়: পারমাণবিক ইতিহাসের ভয়াবহ রাত
চেরনোবিল বিপর্যয়: পারমাণবিক ইতিহাসের ভয়াবহ রাত
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে, যা পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ অধ্যায়ে পরিণত হয়।

ইউক্রেনের প্রিপিয়াত শহরের অধিকাংশ মানুষ সেদিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। আধুনিক ও পরিকল্পিত এই শহরটি তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত হাজারো মানুষের বাস ছিল। শহরের অদূরে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অবশ্য সে রাতেও কাজ চলছিল, ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টরে একটি পরীক্ষা পরিচালনা করা হচ্ছিল। কেউ তখন কল্পনাও করতে পারেনি যে, কয়েক মিনিটের মধ্যে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে, যার তেজস্ক্রিয় প্রভাব শুধু একটি শহর বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে।

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের সেই রাত পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে। চেরনোবিল দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টর ধ্বংস হয়ে যায়, বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে লাখো মানুষের জীবন এই দুর্ঘটনার কারণে বদলে যায়। জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির মূল্যায়নে, দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৩০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং ১০০ জনেরও বেশি মানুষ বিকিরণজনিত আঘাত পান।

সেই রাতের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগেই। তৎকালীন সোভিয়েত ইউক্রেনের প্রিপিয়াত শহরের কাছে অবস্থিত চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আরবিএমকে-১০০০ ধরনের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হতো। ৪ নম্বর ইউনিটটি ১৯৮৩ সালে চালু হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সেখানে একটি পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়।

এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে টারবাইন ঘোরার সময় তার জড়তা থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ কিছু সময়ের জন্য জরুরি পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে সক্ষম হবে কিনা, তা যাচাই করা। পরীক্ষাটি নিজে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। সমস্যা তৈরি হয় পরীক্ষা পরিচালনার পদ্ধতি এবং রিঅ্যাক্টরের কিছু নকশাগত দুর্বলতার কারণে। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, এই দুর্ঘটনাকে কেবল অপারেটরদের ভুল বলে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরবর্তী আইএনএসএজি–৭ বিশ্লেষণে রিঅ্যাক্টরের নকশাগত ত্রুটি উঠে আসে। উচ্চ পজিটিভ ভয়েড কোএফিশিয়েন্ট এবং কন্ট্রোল রডের নকশার সমস্যা দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর অর্থ হলো, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে শক্তি কমার বদলে আরও বাড়তে পারতো।

২৫ এপ্রিল রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডের চাহিদার কারণে পরীক্ষাটি কিছু সময়ের জন্য স্থগিত হয়। এরপর অপারেটরদের একটি দল দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর পরীক্ষাটি চালানোর প্রস্তুতি নেয়।

এই সময়ে রিঅ্যাক্টরের অবস্থা আগের পরিকল্পনার তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে। রিঅ্যাক্টরের শক্তি একটি নিম্ন পর্যায়ে নামানো হলে সেটি প্রত্যাশার মতো স্থিতিশীল থাকেনি। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে জেনন পয়জনিংয়ের মতো প্রক্রিয়াও শক্তি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে। শক্তি ধরে রাখার জন্য অপারেটররা অনেক কন্ট্রোল রড বের করে আনেন।

এর ফলে রিঅ্যাক্টরের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেটিং রিঅ্যাকটিভিটি মার্জিন বা ওআরএম খুব কমে যায়। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, এই সীমা ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে অপারেটরদের কাছে পর্যাপ্ত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তৎকালীন নকশা ও নির্দেশনায়ও গুরুতর দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল।

তারপর আসে সেই কয়েক সেকেন্ড, যা পারমাণবিক ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়। ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা ২৩ মিনিটের দিকে পরীক্ষা শুরু হয়। টারবাইনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমতে থাকায় পানির প্রবাহ এবং রিঅ্যাক্টরের ভেতরের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। আরবিএমকে রিঅ্যাক্টরের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য তখন প্রকটভাবে সামনে আসে; বাষ্পের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের রিঅ্যাকটিভিটি বাড়তে পারে।

পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। অপারেটররা জরুরি শাটডাউন ব্যবস্থা চালু করেন। কিন্তু এখানেও রিঅ্যাক্টরের নকশাগত একটি গুরুতর দুর্বলতা বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। কন্ট্রোল রডের নকশায় এমন গ্রাফাইট ডিসপ্লেসার ছিল, যার কারণে রড প্রবেশের শুরুর মুহূর্তে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাকটিভিটি কমার বদলে সাময়িকভাবে বেড়ে যেত। আইএইএর পরবর্তী বিশ্লেষণ এই নকশাগত ত্রুটিকে দুর্ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

রিঅ্যাক্টরের শক্তি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বেড়ে যায়। একটি বিশাল বাষ্প বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আরেকটি বিস্ফোরণ বা শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে বিবেচনা করা হয়। রিঅ্যাক্টরের ছাদ ও কাঠামো ভেঙে যায়। ৪ নম্বর ইউনিট কার্যত সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। রিঅ্যাক্টরের ভেতরের জ্বলন্ত গ্রাফাইট ও অন্যান্য পদার্থ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আকাশে উঠে যেতে থাকে তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া ও কণা।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...