জাতীয়

অপহরণ মামলায় জামিন জাল নথিতে, বাতিল আদেশ ও পরোয়ানা জারি

অপহরণ মামলায় জামিন জাল নথিতে, বাতিল আদেশ ও পরোয়ানা জারি
অপহরণ মামলায় জামিন জাল নথিতে, বাতিল আদেশ ও পরোয়ানা জারি
অপহরণের মামলায় আদালতে দাখিল করা একটি ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ জাল প্রমাণিত হওয়ায় চার আসামির জামিন বাতিল হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

অপহরণের একটি মামলায় জামিন পেতে আদালতে দাখিল করা একটি ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসার পর আদালত চার আসামির জামিন বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, আদালতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে আলাদা মামলাও হয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, গত ৯ জুন ৫০ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আজিবর রহমান উত্তরা পশ্চিম থানার ৩ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে অপহৃত হন। পরিচিত একজনের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে ফেরার পথে রাজলক্ষ্মী মার্কেটের সামনে একটি সাদা গাড়িতে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। অপহরণকারীরা আজিবরের মাথায় আঘাত করে, চোখ ও মুখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে মারধর করে।

অপহরণের পর স্বজনদের কাছে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আজিবর বাড়িতে না ফেরায় গত ১১ জুন তাঁর স্বজনেরা উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেই রাতেই আজিবরের মেসেঞ্জার থেকে তাঁর স্ত্রীর কাছে ভিডিও কল আসে, যেখানে তাঁকে আটকে রেখে মারধর করতে দেখা যায়। এরপর আবারও এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

আজিবরকে উদ্ধারের আশায় স্বজনেরা ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। গত ১৪ জুন অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী দক্ষিণখান এলাকার ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। একই হিসাবে আজিবরের ভাগনে জহুরুল ইসলামের চাচাতো ভাই সোহেল রানা নিজের হিসাব থেকে আরও ৫ লাখ টাকা পাঠান।

টাকা পাওয়ার পরও অপহরণকারীরা আজিবরকে ছেড়ে না দিয়ে আরও টাকা দাবি করে। আজিবরকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও সোনারগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছিল। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে এবং আজিবরকে হালান অটোস্ট্যান্ড এলাকা থেকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর আজিবরকে উত্তরা কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় গত ১৫ জুন আজিবরের ভাগনে জহুরুল ইসলাম উত্তরা পশ্চিম থানায় ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলায় মো. সজীব মিয়া (২৯), আবদুল আলীম বাবু (৩০), মো. ময়নুদ্দিন (৪০) ও মহিউদ্দিন (৩৬) নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা কারাগারে ছিলেন।

কারাগারে থাকা চার আসামির পক্ষে গত ১৮ জুন আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান আদালতে জামিনের আবেদন করেন। গত ২২ জুন জামিন শুনানির সময় আদালতে ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ নামে একটি দলিল দাখিল করা হয়। এই নথিতে আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের কথা উল্লেখ ছিল।

আদালত দাখিল করা নথিটি বিবেচনায় নিয়ে আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন। কিন্তু পরে এই চুক্তিপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

গত ২৬ জুলাই মামলার ধার্য তারিখে বাদী ও ভুক্তভোগী পক্ষ আদালতকে জানায়, আসামিদের সঙ্গে তাঁদের কোনো আপসনামা বা ব্যবসায়িক চুক্তি হয়নি। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্র সম্পর্কে তাঁরা কিছু জানেন না বলেও জানানো হয়। এরপর আদালত চুক্তিপত্রটি সত্য কি না, তা তদন্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসানকে নির্দেশ দেন।

তদন্তে পুলিশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আল-ফারাবি ট্রেডার্স লিমিটেডের মালিক শরিফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। শরিফুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো চুক্তি হয়নি। বাদী জহুরুল ইসলাম ও ভুক্তভোগী আজিবর রহমানও এমন কোনো চুক্তির বিষয়ে কিছু জানেন না বলে তদন্তে জানান।

তদন্ত কর্মকর্তা ও উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান জানান, আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা চুক্তির সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, তদন্তে জানা গেছে, মুক্তিপণ আদায়ের জন্যই আজিবরকে অপহরণ করা হয়েছিল। আসামিপক্ষ আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্রের পক্ষে কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি।

আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান জানান, আসামিরা দাবি করেছেন আদালতে দাখিল করা নথিটি আসল। আসামিরা বলেছেন, আজিবর রহমানের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল এবং পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য নয়।

উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান গত ৮ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত চার আসামির জামিন বাতিল করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই ঘটনায় জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, আদালতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আলাদা মামলাও হয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...