সারাদেশ

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু চিকিৎসায় দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সংকট ও শয্যার অভাব

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু চিকিৎসায় দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সংকট ও শয্যার অভাব
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু চিকিৎসায় দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সংকট ও শয্যার অভাব
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। জমানো টাকা শেষ করে অনেকে ধার করছেন, শয্যার অভাবে মেঝেতে নিচ্ছেন চিকিৎসা।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেকে জমানো টাকা শেষ করে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অসুস্থতার কারণে অনেকেরই আয়রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে।

বেলায়েত হোসেন (৩৮) নামের একজন ডেঙ্গু রোগী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। শয্যা খালি না থাকায় তাঁকে মেঝেতে জায়গা নিতে হয়েছে।

ফেনী সদর এলাকার বাসিন্দা বেলায়েত চার দিন আগে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসা নেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি চট্টগ্রামে আসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি দুর্বলতা ও তীব্র ব্যথার কথা জানান।

বেলায়েত ফেনীর একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন এবং স্বল্প আয়ে তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ চলে। তিনি বলেন, চিকিৎসার শুরুতে নিজের জমানো টাকা থেকে খরচ করেছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ চালাতে গিয়ে এখন বাধ্য হয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারকর্জ করতে হচ্ছে।

বেলায়েতের স্ত্রী আসমা বেগম তাঁদের ১৪ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে স্বামীর পাশে হাসপাতালে রয়েছেন। তিনিও জানান যে ধারকর্জ করে তাঁদের চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। চিকিৎসকেরা নিয়মিত আসছেন এবং বর্তমানে বেলায়েত আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছেন।

বেলায়েতের মতো আরও অনেক ডেঙ্গু রোগীর ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীদের জন্য ৪০টি শয্যা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত সেখানে ৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।

নির্ধারিত শয্যার চেয়ে ৩৮ জন বেশি রোগী থাকায় তাঁদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীদের পাশে স্বজনেরা বসে আছেন, কেউ ওষুধ নিয়ে ছুটছেন বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজ হাতে অপেক্ষা করছেন। কারও জ্বর এখনো আছে, আবার কারও জ্বর কমলেও শরীরের ব্যথা ও দুর্বলতা কাটেনি।

দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম তিন দিনে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ৩০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসছেন। তাঁদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা এবং চট্টগ্রামের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন।

ফেনী থেকে আসা মোহাম্মদ আবুল হাসেম (৫০) তাঁদেরই একজন। গত ৭ আগস্ট তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয় এবং তিনি ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। গত বুধবার তাঁকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় এবং ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন।

পেশায় দোকানের কর্মচারী আবুল হাসেমও স্বল্প আয়ে সংসার চালান। তাঁর সঙ্গে স্ত্রীও হাসপাতালে এসেছেন। চিকিৎসার পেছনে হওয়া খরচের কিছু অংশ তিনি নিজে দিয়েছেন এবং কিছু টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকায় চিকিৎসা বাবদ তেমন খরচ না হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে টাকা খরচ হয়েছে।

শুধু বেলায়েত বা আবুল হাসেম নন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি অনেক রোগীই চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অধিকাংশ রোগীই দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছেন এবং অসুস্থ হওয়ার পর তাঁদের অনেকেরই আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ধার করেই তাঁদের চিকিৎসার খরচ চালাতে হচ্ছে।

এবারের ডেঙ্গু জ্বরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে, ফলে রোগীদের হাসপাতালেও লম্বা সময় থাকতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ও ডেঙ্গুর ফোকাল পারসন নূর মোহাম্মদ বলেন, আগে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীর জটিলতা বাড়ত। এখন জ্বর থাকা অবস্থাতেই অনেকের জটিলতা বাড়ছে।

নূর মোহাম্মদ আরও জানান, যাঁদের শরীরে অন্য কোনো রোগ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে থাকা জরুরি। জ্বর কমে গেলেই রোগী ঝুঁকিমুক্ত—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, জ্বরের সময় বা জ্বর কমার পর রোগীর অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে যাঁদের অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ কিংবা রোগীর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা মূলত জুলাই ও আগস্ট মাসে বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুনে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১২২ জন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। আগস্টে এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন।

জুনের তুলনায় জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার গুণ বেড়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৬ জন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...