জাতীয়

দেশভাগের স্মৃতি: হিন্দু ও মুসলমানের ভিন্ন উপলব্ধি

দেশভাগের স্মৃতি: হিন্দু ও মুসলমানের ভিন্ন উপলব্ধি
দেশভাগের স্মৃতি: হিন্দু ও মুসলমানের ভিন্ন উপলব্ধি
১৯৪৭ সালের দেশভাগের ৭৯ বছর পরও হিন্দু ও মুসলমানরা এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ভিন্নভাবে স্মরণ করে। পূর্ববঙ্গের হিন্দু উদ্বাস্তুদের মধ্যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হারানোর বেদনা দেখা যায়।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতবর্ষের দুটি বৃহৎ অঞ্চল ধর্মীয় ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। এর ফলে বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম নেয়। গত আগস্টে এই বিভাজনের ৭৯ বছর পূর্ণ হয়েছে।

বিভক্তির এত বছর পরও এই দুই অঞ্চলের মানুষের মনে ফেলে আসা মাটির জন্য এক গভীর টান রয়ে গেছে। আজকের প্রজন্মের মধ্যে সরাসরি এই স্মরণবেদনা না থাকলেও, প্রায়শই সাহিত্য ও সিনেমায় হারানো স্মৃতির পুনরুত্থান দেখা যায়। পাঞ্জাব থেকে চলে আসা উদ্বাস্তুদের নতুন প্রজন্ম তাদের সাবেক পৈতৃক নিবাস সম্পর্কে আগ্রহ দেখায় এবং অনেকে পূর্বপুরুষের ভিটা একবার দেখে আসতে চায়। একইভাবে, পূর্ববঙ্গের সাবেক অধিবাসীদের মধ্যেও নিজেদের পিতৃভূমি নিয়ে গভীর স্মরণবেদনা রয়েছে।

র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদ বঙ্গকে অসমভাবে বিভক্ত করেছিল। ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, বঙ্গ প্রদেশের মোট আয়তন ছিল ৭৭ হাজার ৪৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে পূর্ববঙ্গ পেয়েছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ ভূখণ্ড, যা প্রায় ৪৯ হাজার ২৫৯ বর্গমাইল। পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছিল বাকি ৩৬ শতাংশ। সিলেট তখন আসামের অংশ ছিল, যা গণভোটের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়।

১৯৪১ সালের জনগণনা অনুসারে, বঙ্গের দুই অঞ্চলের জনসংখ্যা অনুপাত ভিন্ন ছিল। পূর্ববঙ্গে প্রায় ২৮ শতাংশ হিন্দু এবং ৭০ শতাংশ মুসলমান ছিল। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬৫ শতাংশ হিন্দু এবং ৩০ শতাংশ মুসলমান ছিল। পুরো বঙ্গের হিসাবে, হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ এবং মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ শতাংশ।

বঙ্গভাগের পর সাধারণ মানুষের ওপর এর গভীর প্রভাব পড়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ হিন্দু পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে চলে যান। এই অভিবাসন পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরে মোট প্রায় ৬০ লাখ হিন্দু পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ভারতে চলে যান।

তুলনামূলকভাবে, ১৯৪৭ সালের পর ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করেন। এই অভিবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিহার প্রদেশ থেকে এসেছিল। তবে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অনেক মুসলমান ১৯৫১-৫২ সালে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী, বাঙালি হিন্দুরা, বিশেষত পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু উদ্বাস্তুরা, বঙ্গভাগ নিয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বেদনা বহন করেছেন। বাঙালি মুসলমানরাও কষ্ট বা অনুশোচনা অনুভব করেছেন, তবে তাঁদের আবেগের ধরন এবং প্রকাশের পথ ভিন্ন ছিল।

হিন্দুদের আক্ষেপ বেশি তীব্র হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অসম অভিবাসন। বঙ্গভাগের সময় লাখ লাখ হিন্দু উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তুলনামূলকভাবে কম মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। এই ব্যাপক উচ্ছেদ হারানোর বেদনাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী স্মৃতি-সংস্কৃতি তৈরি করে।

দ্বিতীয়ত, হারানো বাড়ি। উদ্বাস্তু হিন্দুদের কাছে পূর্ববঙ্গের গ্রাম, পুকুর, খেত এবং মন্দির পবিত্র স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তাদের সাহিত্যে পূর্ববঙ্গকে একটি হারানো স্বদেশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল না। ফলে জন্মভূমি হারানোর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বেদনা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, ভাগাভাগি করা গ্রামীণ জীবনের স্মরণবেদনা। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সত্ত্বেও অনেক হিন্দু উদ্বাস্তু তাঁদের মুসলমান প্রতিবেশীদের স্নেহভরে স্মরণ করেন। মৌখিক ইতিহাসে প্রায়শই হিংসার নায়ক বা উসকানিদাতাদের থেকে সাধারণ মুসলমান গ্রামবাসীকে আলাদা করে দেখা যায়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কণ্ঠশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার চেচরীরামপুর গ্রামের পৈতৃক ভিটায় প্রথমবারের মতো পা রাখেন। এ সময় তিনি আবেগে কেঁদে ফেলেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...