জাতীয়

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণদের গণ-আন্দোলন: বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণদের গণ-আন্দোলন: বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণদের গণ-আন্দোলন: বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
গত পাঁচ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে ছয়টি গণ-আন্দোলন আঞ্চলিক রাজনীতিকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। এসব আন্দোলনে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও অর্থনৈতিক হতাশা প্রকাশ পেয়েছে।

গত পাঁচ বছরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণদের নেতৃত্বে ছয়টি সরকারবিরোধী ও প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন দেখা গেছে। এসব আন্দোলন এই অঞ্চলের রাজনীতিকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের দক্ষতা, অর্থনৈতিক হতাশা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি গভীর অনাস্থা প্রতিটি আন্দোলনের মূল কারণ ছিল। তবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিন্নতার কারণে এসব আন্দোলনের ফলাফলও ভিন্ন হয়েছে।

এই ধারার শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে, যখন দেশটির সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। এর প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলেও নতুন সামরিক সরকার কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তরুণ প্রজন্ম জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ও বেসামরিক প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

২০২২ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কায় ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন শুরু হয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে। জ্বালানি পাম্পে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা রাজাপক্ষে পরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করে দেয়। প্রায় দুই দশক ধরে এই পরিবারই দেশ শাসন করেছিল। বিক্ষোভ পুরো দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ দখল করে নেয়। তবে মিয়ানমারের মতো শ্রীলঙ্কায় সহিংসতা বাড়েনি বা দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়নি। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে জনচাপের কাছে নতি স্বীকার করে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পদত্যাগ করেন।

২০২৩ সালের মে মাসে পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর দাঙ্গা শুরু হয়। এটি ছিল একটি জনতুষ্টিবাদী আন্দোলন, যেখানে জনপ্রিয় এক নেতাকে ঘিরে মানুষ সেনাবাহিনীর প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। এর জবাবে সেনা মোতায়েন করা হয়, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়। এর ফলে দেশটির 'হাইব্রিড' শাসনব্যবস্থা টিকে যায়, তবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হয়।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন দেখিয়েছে, একটি ছোট নীতিগত বিরোধও কীভাবে বিপ্লবে পরিণত হতে পারে। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সীমিত একটি দাবি নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় আন্দোলন দ্রুত বড় হয়ে ওঠে। হাসিনা কারফিউ জারি করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেন এবং কারফিউ ভঙ্গকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনী সেই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকৃতি জানালে হাসিনার ক্ষমতা ধরে রাখার ভিত্তি ভেঙে পড়ে। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পায়।

নেপালে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কোনো একজন নেতাকে লক্ষ্য করে হয়নি। এর লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা একটি সুবিধাভোগী রাজনৈতিক শ্রেণি। প্রায় এক দশক ধরে এই শ্রেণি প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে একধরনের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলায় ব্যস্ত ছিল। অন্যদিকে অধিকাংশ নেপালি তরুণ ভয়াবহ বেকারত্ব ও সুযোগের অভাব মোকাবিলা করছিল। ক্ষুব্ধ জেন-জির জন্য বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল শেষ আঘাত। তরুণেরা ভিপিএন ও বিকল্প অ্যাপ ব্যবহার করে বিশাল বিক্ষোভ সংগঠিত করেন। কর্তৃপক্ষ শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল, কিন্তু বিক্ষোভকারীরা পাল্টা প্রতিরোধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অভিজাতদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। তবে সংসদীয় কাঠামো ধ্বংস হয়নি। পরে নেপালের মানুষ ৩৫ বছর বয়সী একজন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন।

এই গ্রীষ্মে ভারতেও ব্যাপক শিক্ষার্থী আন্দোলন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে তরুণদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ যুক্ত হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...