জাতীয়

মানবাধিকার বিল অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক আস্থা

মানবাধিকার বিল অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক আস্থা
মানবাধিকার বিল অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক আস্থা
ক্যাবিনেটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ বিল ২০২৬ অনুমোদিত হয়েছে। নতুন বিলগুলো মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান এবং আস্থার প্রশ্ন উঠেছে।

ক্যাবিনেটে সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ বিল ২০২৬ অনুমোদিত হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক উপস্থিতি হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সামনে রয়েছে। এই সময়ে দুটি বিলের অনুমোদন আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে বার্তা দেবে।

সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বার্তা দিতে চাইছে যে দেশ অতীতের অবস্থা থেকে সরে এসে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করছে। একইসঙ্গে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ তৈরির বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার-সংক্রান্ত দুটি বিলের অনুমোদন দেশের ভেতরের মানবাধিকার ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে কীভাবে দেখা হবে, সেই প্রশ্নে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। কারণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শুধু বাংলাদেশের নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবেও মূল্যায়িত হয়। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস নামের আন্তর্জাতিক সংস্থা প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী কোনো দেশের মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে।

বর্তমানে বাংলাদেশের কমিশন স্ট্যাটাস ‘বি’তে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কেবল মালদ্বীপ একই অবস্থানে আছে। ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা স্ট্যাটাস ‘এ’তে রয়েছে। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোও স্ট্যাটাস ‘এ’তে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও স্ট্যাটাস ‘এ’তে উন্নীত হয়েছে।

নতুন আইন প্রণয়নের সময় স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ অন্তত স্ট্যাটাস ‘এ’-এর দিকে এগোবে। তবে বর্তমান বিলটি দেখে সেই সম্ভাবনা আরও দূরে বলে মনে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত। পুলিশ, র‍্যাব বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শুরুতেই নিজের তদন্ত করতে পারবে না।

অভিযোগটি প্রথমে সেই সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছেই যাবে। অর্থাৎ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রথম তদন্তটিও সেই প্রতিষ্ঠানই করবে। পরে তাদের জবাব কমিশনের কাছে সন্তোষজনক না হলে কমিশন অন্য ব্যবস্থা নিতে পারবে। তত দিনে একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়ে যেতে পারে। কমিশনের নিজের সংগ্রহ করা প্রমাণ তখন থাকবে না।

ফলে বাহিনীর বক্তব্য সঠিক কি না, সেটি যাচাই করার ভিত্তিও দুর্বল থাকবে। এর মধ্যে সময় চলে গেলে সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডেটা, কাস্টডি রেজিস্ট্রার বা মেডিকেল রেকর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও হারিয়ে যেতে পারে। এখানে আরেকটি বিষয় আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষভাবে চোখে পড়বে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বিশেষ তদন্ত দলকে স্বাধীনভাবে তদন্তের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

নতুন বিল সেই সুযোগ সরিয়ে দিচ্ছে। তাই সরকার শুধু এই যুক্তি দিয়ে পার পাবে না যে নতুন আইনটি ২০০৯ সালের আইনের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে ভালো। বাইরে থেকে আরও সহজ একটি প্রশ্ন করা হবে: যে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা গত বছর আইনে ছিল, সেটি এবার কেন বাদ দেওয়া হলো? এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ।

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস কোনো দেশের মানবাধিকার কমিশনের পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন হলে বিশেষ পর্যালোচনা করতে পারে। বাংলাদেশের নিয়মিত ‘অ্যাক্রেডিটেশন রিভিউ’ অনেক দিন ধরে বাকি রয়েছে। ফলে নতুন আইন পাসের পর আলোচনাটি শুধু বাংলাদেশ কবে স্ট্যাটাস ‘এ’ পাবে, সেটি না-ও হতে পারে। বর্তমান স্ট্যাটাস ‘বি’ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এমন কোনো নেতিবাচক আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন শুধু মানবাধিকার মহলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর একটি উদাহরণ হলো ‘অ্যাসাইলাম ক্লেইম’ বা রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাজ্যে অ্যাসাইলাম ক্লেইমের উৎস হিসেবে বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে। এসব মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকে, কেউ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিযোগ করলে নিজের দেশে কার্যকর সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ আছে কি না।

যদি বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনই পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে না পারে, তাহলে অ্যাসাইলাম ক্লেইম করা ব্যক্তি ও তাঁদের আইনজীবীদের জন্য সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হয়ে উঠবে। সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও বিদেশে এই কথা বলতে পারে যে নতুন সরকার সংস্কারের কথা বললেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহির জায়গায় আবার পুরোনো ধরনের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...