দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পোশাক এবং মাথার টুপি দীর্ঘকাল ধরে আদর্শ, জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মহাত্মা গান্ধীর ‘গান্ধী টুপি’ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সামরিক টুপির মতোই ‘জিন্নাহ টুপি’ এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এটি শুধু একটি পোশাক নয়, বরং বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামের সঙ্গে এই টুপির পরিচিতি যুক্ত হলেও এর ব্যবহার শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এটি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ঐতিহ্য, আভিজাত্য এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই টুপি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে এবং পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদকে জিন্নাহ টুপি ও শেরওয়ানি পরতে দেখা যেত। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের পোশাক পরেছেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের একটি দীর্ঘ সময়েও জিন্নাহ টুপির ব্যবহার দেখা যায়।
তৎকালীন সময়ে এই টুপি মুসলিম মধ্যবিত্ত ও অভিজাত রাজনৈতিক শ্রেণির পরিচিত পোশাকগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিভিন্ন নেতার মাথায় মাঝেমধ্যে এই টুপি দেখা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের নেতাদেরও জিন্নাহ টুপি পরতে দেখা গেছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও টুপিটির ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে রমজানসহ ধর্মীয় বিভিন্ন সময়ে এর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়ে। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবেও বিবেচিত।
শুধু রাজনীতি নয়, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে জিন্নাহ টুপি একসময় আভিজাত্য, শিক্ষা, নেতৃত্ব এবং মুসলিম জাতিসত্তার প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের শহুরে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পুরুষদের পোশাকে এই ধরনের টুপি বিশেষভাবে দেখা যেত। এটি এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা প্রকাশ করত।
আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী কারাকুল টুপি পরার মাধ্যমে এটিকে নতুন করে বিশ্ব পরিচিতি দেন। এমনকি ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এ ধরনের টুপি পরা অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতেও পরবর্তী প্রজন্মের অনেক নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে এই টুপি ব্যবহার করেছেন।



মতামত (0)