সারাদেশ

এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ প্রচার: গাইবান্ধার এক ব্যক্তি শনাক্ত

এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ প্রচার: গাইবান্ধার এক ব্যক্তি শনাক্ত
এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ প্রচার: গাইবান্ধার এক ব্যক্তি শনাক্ত
মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ তৈরির একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে। গাইবান্ধায় অবস্থানকারী এক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের পক্ষে এসব কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের কার্যক্রম চালিয়েছেন।

মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক এআই ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ তৈরির একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে। এই নেটওয়ার্কটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন পক্ষকে লক্ষ্য করে অপতথ্য ছড়াচ্ছিল। গাইবান্ধায় অবস্থানকারী এক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে এই কার্যক্রম চালিয়েছেন বলে অ্যানথ্রোপিকের দাবি।

অ্যানথ্রোপিকের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহার করে বাংলায় ভুয়া শিরোনাম, বানানো সংবাদ ও ছবি তৈরির নির্দেশনা প্রস্তুত করা হতো। এসব কনটেন্টের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত তৈরি এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থানকারী ওই ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেন। অ্যাকাউন্টের ব্যবহারসীমা ও শনাক্তকরণ এড়াতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি ধারণা করছে। ওই ব্যক্তি ‘ফেক নিউজ ৩’ নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন, যা ক্লডের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট কাঠামোয় কনটেন্ট তৈরি করত।

প্রতিবার ১৫টি ভুয়া শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানানো সংবাদ এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি প্রম্পট তৈরি করা হতো। অ্যানথ্রোপিকের হিসাবে, পুরো কার্যক্রমে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা সংবাদবিষয়ক বর্ণনা এবং ছবি তৈরির ১ হাজার ৫০০টি প্রম্পট তৈরি করা হয়েছে। মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখানে সীমিত ছিল। ক্লডের এপিআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলা শিরোনাম ও সংবাদ তৈরি করা হতো।

পরে সেগুলো সংরক্ষণ, অডিও-ভিডিওতে রূপান্তর এবং ইউটিউবে প্রকাশের কাজও স্ক্রিপ্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছিল। এমনকি ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি এক মাস আগেই নির্ধারণ করা যেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের দাবি, তৈরি করা ভুয়া কনটেন্টের প্রধান লক্ষ্য ছিল তুলনামূলক কম সাক্ষরতার হার রয়েছে—এমন এলাকা ও গ্রামের মানুষ।

ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ভিডিও আকারে এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। নেটওয়ার্কটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এসব কনটেন্টকে নিজেরাই ‘ফেক নিউজ’ হিসেবে উল্লেখ করত। ভাষা ও উপস্থাপনা এমনভাবে তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যাতে সেগুলো উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক হয় এবং গ্রামের মানুষের কাছেও সহজে বোধগম্য হয়।

অ্যানথ্রোপিকের তদন্তে বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক চ্যানেল ও প্রোফাইলে এসব কার্যক্রমের ভিডিওর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে সব কনটেন্ট কোন কোন নির্দিষ্ট চ্যানেল বা অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত হয়েছে, তা শনাক্ত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এসব ভিডিও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের বাইরে মোট কত দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির তৈরি কনটেন্টে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য ছড়ানো হতো। কিছু প্রচারণায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে তুলে ধরা হয়। আবার কোথাও তাদের বিরুদ্ধে ‘তালেবান-ধাঁচের শাসন’ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রোপিক।

তবে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা, নির্দেশনা বা অর্থায়ন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। অ্যানথ্রোপিক আরও বলেছে, কিছু কনটেন্টের বক্তব্য ভারতের পক্ষে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এসব কার্যক্রমের পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

তদন্তের পর সংশ্লিষ্ট ক্লড অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করেছে অ্যানথ্রোপিক। একই ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টরা ভবিষ্যতে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে আবারও এ ধরনের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে পারেন- এমন আশঙ্কায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ঘটনাটিকে শুধু রাজনৈতিক প্রচারণার উদাহরণ হিসেবে নয়, এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে অপতথ্য তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন ধরনের প্রবণতা হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...