প্রযুক্তিএআই গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদকের সমপরিমাণ নম্বর অর্জন করেছে
এআই গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদকের সমপরিমাণ নম্বর অর্জন করেছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আলফাপ্রুফ ও আলফাজ্যামিতি ২ আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদক পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নম্বর অর্জন করেছে, এমনকি সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নও সমাধান করেছে।
২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে নতুন এক প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আলফাপ্রুফ। পৃথিবীর ১০৮টি দেশ থেকে আসা শত শত তরুণ গণিতবিদের মতো এটিও ছয়টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। ১৯৫৯ সাল থেকে চলে আসা এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণ গণিতপ্রেমীরা অংশ নেয়। এই মঞ্চ থেকে অনেক ফিল্ডস মেডেলজয়ী গণিতবিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
এই এআই মডেলটির নাম আলফাপ্রুফ, যা গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি। এটি সত্যি সত্যি কোনো পদক পায়নি, তবে রৌপ্যপদক পেতে যে নম্বর অর্জন করতে হয়, সেই নম্বর অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। আলফাপ্রুফ ও আলফাজ্যামিতি ২ নামের দুটি এআই সিস্টেম সে বছর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে চারটি সঠিক সমাধান দিতে পেরেছিল। ৪২ নম্বরের মধ্যে তারা ২৮ নম্বর অর্জন করে।
ওই বছর রৌপ্যপদকের জন্য ২২ নম্বর প্রয়োজন ছিল, ফলে আলফাপ্রুফের ২৮ নম্বর অনায়াসেই রৌপ্যপদকের সীমা অতিক্রম করে। এমনকি স্বর্ণপদকের জন্য ২৯ নম্বর প্রয়োজন ছিল, অর্থাৎ মাত্র এক নম্বরের জন্য এটি স্বর্ণপদক পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। এই ফলাফল পরে বিজ্ঞান সাময়িকীতে পিয়ার-রিভিউ হয়ে প্রকাশিত হয়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, আলফাপ্রুফ একাই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি, যা ৬ নম্বর প্রশ্ন ছিল, সমাধান করতে পেরেছিল। ওই বছর বিশ্বের ৬০৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন মানুষ এটি সম্পূর্ণ সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল। জ্যামিতির চতুর্থ প্রশ্নটি সমাধান করেছিল আলফাজ্যামিতি ২ নামের আরেকটি এআই সিস্টেম।
আলফাপ্রুফ চ্যাটজিপিটির মতো সাধারণ ভাষানির্ভর এআই মডেল নয়। চ্যাটজিপিটি বিপুল পরিমাণ লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করে, কিন্তু আলফাপ্রুফ সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে কাজ করে। এর ভিত্তি হলো রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং পদ্ধতি। ডিপমাইন্ডের ‘আলফাজিরো’ এই পদ্ধতিতেই দাবা খেলায় বিশ্বসেরা মানব খেলোয়াড়দের পরাজিত করার দক্ষতা অর্জন করেছিল।
এখানে খেলার বোর্ডের পরিবর্তে লিন নামে একটি ফরমাল থিওরেম-প্রুভিং সিস্টেম ব্যবহৃত হয়। লিন একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা, যা কোনো ধাপ বাদ না দিয়ে প্রতিটি যুক্তি যাচাই করে। ফলে কোনো প্রমাণে সামান্যতম যুক্তিগত ত্রুটি থাকলেও তা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে। আলফাপ্রুফকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রথমে প্রায় ১০ লাখ সাধারণ গাণিতিক সমস্যাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফরমালাইজ করে লিনে আনুষ্ঠানিক ভাষায় রূপান্তর করা হয়।
এরপর সেখান থেকে প্রায় ১০ কোটি ফরমাল সমস্যা তৈরি করে সিস্টেমটিকে আরও জটিল গাণিতিক প্রমাণ খুঁজে বের করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কোনো অলিম্পিয়াডের সমস্যা সামনে এলে আলফাপ্রুফ সম্ভাব্য বহু প্রমাণের পথ অনুসন্ধান করে। প্রতিটি ধাপ লিনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে দেখা হয়, কোনটি গাণিতিকভাবে বৈধ।
ভুল পথগুলো বাদ দিয়ে এবং সফল প্রমাণ থেকে শিক্ষা নিয়ে সিস্টেমটি ধাপে ধাপে আরও উন্নত হয়। আলফাপ্রুফ মানুষের মতো অনুমাননির্ভর উত্তর দেয় না; বরং সম্ভাব্য প্রমাণ তৈরি করে, প্রতিটি ধাপ কঠোরভাবে যাচাই করে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি নির্ভুল গাণিতিক প্রমাণে পৌঁছায়। জ্যামিতির প্রশ্নগুলোর জন্য আলফাজ্যামিতি ২ নামে আলাদা একটি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছিল, কারণ জ্যামিতিক সমস্যার গঠন বীজগণিত বা সংখ্যাতত্ত্বের চেয়ে ভিন্ন যুক্তি দাবি করে।
মতামত (0)