প্রযুক্তি

এআই ও ডেটা সায়েন্সে আইএসইউর নতুন যাত্রা: ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি গঠনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

এআই ও ডেটা সায়েন্সে আইএসইউর নতুন যাত্রা: ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি গঠনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ
এআই ও ডেটা সায়েন্সে আইএসইউর নতুন যাত্রা: ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি গঠনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ
আইএসইউ চালু করেছে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইন এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স প্রোগ্রাম। | প্রথম আলো ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটির এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার নতুন সূচনা প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩: ০৬ আইএসইউ চালু করেছে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারি

ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি (আইএসইউ) সম্প্রতি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স প্রোগ্রাম চালু করেছে, যা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই অত্যাধুনিক প্রোগ্রামটি শুধু পুস্তকের জ্ঞান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অত্যাধুনিক এআই ইনোভেশন ল্যাবের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অ্যাডভান্সড সায়েন্স অ্যান্ড কম্পিউটিং অনুষদের অধীনে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামটির অনুমোদন দিয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন, যা প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

এই ১৫২ ক্রেডিটের বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিকস, সাইবার সিকিউরিটি এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণা, আধুনিক ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অংশগ্রহণের ব্যাপক সুযোগ থাকবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারবে এবং বাস্তব বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটা সায়েন্স এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত ধারণা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ডেটা সায়েন্স তথ্যকে কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপান্তর করছে, যা উদ্ভাবনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই দুটি ক্ষেত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে যখন একটি নতুন ধারণা সমগ্র কাজের ধরনকে বদলে দেয়, আর এআই ঠিক তেমনই এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিশ্বজুড়ে এআই ও ডেটা সায়েন্সে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষা খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, যা দেশের তরুণদের জন্য এক সোনালী ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তৈরি করছে।

আইএসইউর এই প্রোগ্রামটি শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তবসম্মত প্রকল্প এবং গবেষণার মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অত্যাধুনিক এআই ইনোভেশন ল্যাবটি এই প্রক্রিয়ার একটি মূল অংশ, যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করতে পারবে। এই ধরনের ব্যবহারিক শিক্ষা ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে এআই বিশেষজ্ঞ, ডেটা সায়েন্টিস্ট, মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতো পেশাগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকবে। আইএসইউর এই প্রোগ্রাম থেকে স্নাতক সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় কর্মবাজারেই বিস্তৃত ক্যারিয়ারের সুযোগ পাবেন। তাঁরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই রিসার্চার, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, বিজনেস অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবেন।

সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, শিক্ষা, টেলিযোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতেও এই দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রোগ্রামটি শিক্ষার্থীদের জন্য এমন এক ভিত্তি তৈরি করবে, যা তাদের বহুমুখী কর্মক্ষেত্রে সফল হতে সাহায্য করবে।

আইএসইউর এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হাকিকুর রহমান এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্স এখন শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের ভিত্তি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান দিলেই হবে না, বরং বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক রহমান জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।” তাঁর এই বক্তব্য আইএসইউর শিক্ষাদানের দর্শন এবং ভবিষ্যতের প্রতি তাদের অঙ্গীকারকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এই ধরনের দূরদর্শী পদক্ষেপ দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

বিশ্বব্যাপী এআই ও ডেটা সায়েন্স-সংশ্লিষ্ট দক্ষ পেশাজীবীদের চাহিদা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এ খাতের পারিশ্রমিকও। বাংলাদেশে ক্যারিয়ারের প্রাথমিক পর্যায়েই দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী মাসিক বেতন ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা হতে পারে। অভিজ্ঞতা, বিশেষায়িত দক্ষতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে এই আয় লাখ টাকার বেশি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে প্রতিষ্ঠান, দেশ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এআই ও ডেটা সায়েন্টিস্টদের বার্ষিক আয় কয়েক হাজার ডলার থেকে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে এআই ও ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা শুধু বাংলাদেশের কর্মবাজারেই নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তিশিল্পেও প্রতিযোগিতামূলক ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিদ্যমান মানগত ও সক্ষমতার ব্যবধান কমাতে নিরলসভাবে কাজ করছে। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন তিস্তা ইউনিভার্সিটির নবীন শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন যে, উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন্বিত ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদার এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইএসইউর এই প্রোগ্রামটি সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের ওপর জোর দিয়েছেন। আইএসইউর নতুন প্রোগ্রামটি শিক্ষার্থীদের এই ধরনের সামগ্রিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে, যা তাদের শুধু সনদধারী নয়, বরং দক্ষ, মানবিক ও উদ্ভাবনী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। এটি দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টার অংশ।

আইএসইউ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল সাশ্রয়ী ব্যয়ে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা প্রদান করা, যা দেশের শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের দুই কর্ণধার ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম মোশাররফ হুসাইন ও ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমানের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। এই লক্ষ্য পূরণে আইএসইউ শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় ওয়েভার সুবিধা রেখেছে, যেখানে এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ওয়েভার পাওয়া যায়। এটি মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রযুক্তিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর উদ্যোগের জন্য বাংলালিংকের ‘রাইজ’ প্ল্যাটফর্মের বৈশ্বিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, এআই প্রযুক্তি এখন আর শুধু গবেষণার বিষয় নয়, বরং বাস্তব জীবনে এর কার্যকর প্রয়োগ সম্ভব। আইএসইউর এই নতুন প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর একটি উজ্জ্বল পথ তৈরি করবে এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এই ধরনের শিক্ষামূলক উদ্যোগগুলো দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...