প্রবাসী

এআইয়ের যুগে মানুষের শেখার ক্ষমতা ও চিন্তার অভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ

এআইয়ের যুগে মানুষের শেখার ক্ষমতা ও চিন্তার অভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ
এআইয়ের যুগে মানুষের শেখার ক্ষমতা ও চিন্তার অভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার মানুষের শেখার ক্ষমতা ও চিন্তার অভ্যাস কমিয়ে দিতে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে। সুইডেনের পিআইএসএ ফলাফল এবং স্কোলভারকেটের প্রতিবেদন এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে, যেখানে সিঙ্গাপুরের ভিন্ন শিক্ষাদর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে শেখার মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে। আগুন, চাকা, ছাপাখানা, কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন মানুষের শেখার ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর এই যুগে একটি নতুন প্রশ্ন উঠেছে: প্রযুক্তি কি মানুষের শেখার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে?

এআই এখন লিখতে, অনুবাদ করতে, হিসাব করতে, কোড লিখতে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে, ছবি তৈরি করতে এবং গবেষণার প্রাথমিক কাজ করতে সক্ষম। মানুষের মস্তিষ্ক যে কাজগুলো করতে বহু বছর অনুশীলন করেছে, তার অনেকগুলোই এখন একটি যন্ত্র কয়েক সেকেন্ডে করে দিতে পারে। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে, এআই মানুষের কাজের কতটা অংশ নিয়ে নেবে এবং এটি মানুষের নিজের চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা কতটা কমিয়ে দেবে।

মানুষ যদি ধীরে ধীরে প্রশ্ন করার বদলে উত্তর গ্রহণ করতে শেখে, বোঝার বদলে সারাংশ নিতে শেখে, লিখতে শেখার বদলে এআই দিয়ে লিখিয়ে নিতে শেখে বা হিসাব শেখার বদলে হিসাব করিয়ে নেয়, তাহলে এর প্রভাব কেবল চাকরি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন মানুষের শেখার ক্ষমতা, চিন্তার অভ্যাস এবং বিচার করার শক্তি হারাতে শুরু করতে পারে। এআই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় করবে না, বরং মানুষ নিজেই নিজেকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে।

শিক্ষাব্যবস্থা এই আশঙ্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার হতে পারে। একটি শিশুকে শুধু তথ্য দেওয়া হয় না, তাকে চিন্তা করতেও শেখানো হয়। যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখার এই জায়গাটি মানুষ নিজেই দখল করে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতের মানুষ স্বাধীনভাবে কতটা চিন্তা করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পিআইএসএ (PISA) ২০২৫-এর ফলাফলে সুইডেনের শিক্ষাব্যবস্থায় উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। সুইডেনের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার স্কোর ২০২২ সালের তুলনায় ২১ পয়েন্ট কমে ৪৬৬ হয়েছে। গণিতে তাদের স্কোর ১৮ পয়েন্ট কমে ৪৬৪-এ দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞানে স্কোর ৪৮৫, যা ৮ পয়েন্ট কমলেও এই পরিবর্তনটি পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য নয়। একই সময়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD)-এর গড়ও পড়া ও গণিতে উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে। এই ফলাফল সরাসরি টিকটক, স্মার্টফোন বা এআইয়ের কারণে হয়েছে বলা যাবে না, কারণ পিআইএসএ এমন কোনো সরল কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না।

তবে এই ফলাফল আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে যে, আমরা প্রযুক্তিকে শিক্ষার জন্য ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই ধীরে ধীরে শিক্ষার জায়গা দখল করছে। সুইডেনের নিজস্ব স্কোলভারকেটের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, উচ্চবিদ্যালয়ের নিচের স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ির কাজ ও স্কুলের কাজে এআই ব্যবহারের হার বেড়েছে। ২০২৪ সালের ২৫ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে এই হার ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।

১৭-১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি জানিয়েছে, তারা স্কুলের কাজে লেখা সংক্ষেপ করা বা তৈরি করার জন্য এআই চ্যাটবোট ব্যবহার করে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহার করে প্রতারণার কথাও শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। সুইডেনের স্কোলভারকেট এই বিষয়টিকে গুরুতর বলে দেখছে।

দ্রুত উত্তর পাওয়া আর গভীরভাবে শেখা এক জিনিস নয়। একজন শিক্ষার্থী এআইকে দিয়ে একটি কঠিন বিষয় সহজ ভাষায় বুঝিয়ে নিতে পারে, যা শিক্ষার সহায়ক হতে পারে। সে কোনো ধারণা নিয়ে আরও প্রশ্ন করতে পারে, ভুল ধরতে পারে এবং নিজের লেখার উন্নতি করতে পারে, যা ইতিবাচক।

কিন্তু একই শিক্ষার্থী যদি এআইকে দিয়ে পুরো উত্তর লিখিয়ে নেয় এবং নিজে না পড়ে, না বোঝে, না যাচাই করে, তাহলে সে হয়তো একটি ভালো বাড়ির কাজ জমা দিল, কিন্তু তার জ্ঞান বাড়ল না। এখানেই এআইয়ের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব দেখা যায়। একই প্রযুক্তি একজন মানুষকে আরও জ্ঞানী করতে পারে, আবার অন্য একজনকে আরও নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।

সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা এই বিষয়ে ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে। সিঙ্গাপুর পিআইএসএ ২০২৫-এ বিজ্ঞান, গণিত ও পড়াশোনায় বিশ্বের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সকারী শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার থেকে পিছিয়ে নেই।

প্রায় ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা সপ্তাহে অন্তত একবার শেখার জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে। প্রায় ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, স্কুলের পাঠে তাদের এআই দিয়ে তৈরি তথ্যের মান যাচাই করতে শেখানো হয়। এখানে পার্থক্যটি এআই ব্যবহারের পরিমাণে নয়, বরং ব্যবহারের দর্শনে। সিঙ্গাপুর যেন শিক্ষার্থীকে এআই ব্যবহার না করতে বলছে না, বরং বলছে ‘এআই ব্যবহার করো, কিন্তু এআই যা বলছে, তা যাচাই করতে শেখো’।

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এআইয়ের উত্তরকে শেষ কথা হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখা উচিত।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...