প্রবাসী

পরিবারের খাবার টেবিলে শিক্ষা ও বুদ্ধিমত্তার মজার বিতর্ক

পরিবারের খাবার টেবিলে শিক্ষা ও বুদ্ধিমত্তার মজার বিতর্ক
পরিবারের খাবার টেবিলে শিক্ষা ও বুদ্ধিমত্তার মজার বিতর্ক
একজন গণিত শিক্ষক ও তার স্ত্রীর মধ্যে পরিবারের খাবার টেবিলে মাছি তাড়ানো এবং শিক্ষার সংজ্ঞা নিয়ে একটি মজার বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যেখানে মা তার শিক্ষকের চেয়ে নিজেকে বেশি শিক্ষিত দাবি করেন।

অমৃতপুর মহাবিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক মোজাম্মেল স্যার ক্লাস ছুটির পর রিকশায় করে বাসায় ফিরতে অভ্যস্ত। আজ তিনি কলেজ থেকে বের হয়ে কোনো খালি রিকশা পাননি। রাস্তায় নেমে অনেকক্ষণ ধরে তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে অপেক্ষারত ছিলেন।

এ সময়ে সাধারণত যানবাহন অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে এবং অফিসগামী কর্মচারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে রাস্তা পূর্ণ থাকে। তবে আজকের চিত্র ভিন্ন ছিল, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম মনে হচ্ছিল। তীব্র গরমে প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে আছে এবং তার কাছে ছাতাও ছিল না।

প্রায় এক ঘণ্টার মতো হেঁটে তিনি বাসার মূল দরজার সামনে পৌঁছান। ঘামে ভিজে ক্লান্ত অবস্থায় তিনি দরজায় আঘাত করেন। কিছুক্ষণ পর তার ১২ বছর বয়সী কন্যা আম্বিয়া দরজা খুলে দিয়ে খাবারের ঘরের দিকে ছুটে যায়।

মোজাম্মেল স্যার জামা পাল্টে বসার ঘরে বসলেন এবং গলা ছেড়ে তার কন্যা আম্বিয়াকে ডাকলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পেলেন না। তিনি আবার তার অন্য কন্যা আকলিমাকে ডাকলেন, কিন্তু তাতেও কোনো উত্তর আসেনি। এরপর তিনি তার পুত্র মোজাফফরকে ডাকেন।

অবশেষে তিনি তার স্ত্রী পরী বানুকে ডাকলেন, ‘আম্বিয়া-আকলিমা-মোজাফফরের আম্মু, পরী বানু …!’ খাবারের ঘর থেকে আম্বিয়ার গলা শোনা গেল যে তাদের মা গোসল করছেন। মোজাম্মেল স্যার উঠে খাবারের ঘরের দিকে গেলেন।

সেখানে গিয়ে তার দুই চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি তার তিন সন্তান আম্বিয়া, আকলিমা ও মোজাফফরকে খাবার টেবিলের পাশে মাছি মারার ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? করছ কী তোমরা তিনজনে মিলে?’

আম্বিয়া তাকে জানালো, ‘আব্বু আমরা খাবার পাহারা দিচ্ছি!’ ১১ বছরের কন্যা আকলিমা ব্যাখ্যা করে বলল, ‘মাছি বসে, তা–ই!’ তাদের দুই বছরের ছোট মোজাফফর যোগ করলো, ‘ওরা খুব দুষ্টু আর চালাক!’

মোজাম্মেল স্যার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাদের সরে যেতে বললেন এবং নিজেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেন। রান্নাঘর থেকে কয়েকটি থালা এনে তিনি খাবার টেবিলে রাখা সব পাত্র ঢেকে দিলেন। তিনি সন্তানদের বললেন, ‘এবার হয়েছে। যাও তোমরা’ এবং নিজে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেলেন।

এর মধ্যে তার স্ত্রী পরী বানু স্নান সেরে খাবার ঘরে আসেন। তিনি দেখলেন তার তিন সন্তান টেবিলের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের হাতে মাছি মারার হাতিয়ার নেই। তিনি গলা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘খাবার কে ঢেকেছে?’ মোজাফফর উত্তর দিল, ‘আব্বু!’

পরী বানু তখন বললেন, ‘তোদের আব্বু আমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়ে গেছে …!’ এই কথা বলে তিনি খাবারের সব কটি পাত্র উন্মুক্ত করে দিলেন। তিনি সন্তানদের নির্দেশ দিলেন, ‘এই তোরা দেখ, মাছি আসে কি না। আসলেই মেরে ফেলবি। একটি মাছিও যেন খাবারে না বসে। বসলে খবর আছে কিন্তু…!’

আম্বিয়া তার মাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘আম্মু তুমি নাকি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছ। আর আব্বু কলেজে অঙ্ক পড়ায়।’ পরী বানু কপালে দুই চোখ তুলে বললেন, ‘তা পড়াক! কিন্তু আমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়নি তোদের আব্বু। তাতে হয়েছেটা কী? আমি তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত। হ্যাঁ স্কুল-কলেজের শিক্ষার বিষয়টা অন্য জিনিস!’

আম্বিয়া মুখ টিপে হেসে জানতে চাইলো, ‘কী ভাবে?’ পরী বানু তাকে হাসতে বারণ করে বললেন, ‘এই ভাবে হাসছিস ক্যান? শুনিসনি উকিলের বাড়ির বিড়ালও ওকালতি জানে! আমি তো মাস্টারের বউ। তোদের মাস্টার আব্বুর চেয়ে বড় মাস্টার এই আমি! বুঝেছিস?’ এরপর তিনি সবার হাতে মাছি মারার ব্যাট তুলে দিয়ে বললেন, ‘এই তোরা দাঁড়িয়ে থাক। আমি দেখি তোদের মাস্টার আব্বু করছে কী।’

মোজাম্মেল স্যার এতক্ষণ বসার ঘরেই ছিলেন এবং এবার তিনি এগিয়ে এলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘আমাদের বাড়ির মাছিরাও জানে তুমি অনেক শিক্ষিত। তাই ওরাও শিক্ষিত হয়ে গেছে! একই সঙ্গে ওরা আরও বেশি চালাক হয়েছে! নতুন নতুন বুদ্ধি এঁটে ওরা তোমার খাবারে ভাগ বসায়।’ তিনি প্রস্তাব করলেন, ‘এবার আমরা সবাই একসঙ্গে খেতে পারি নিশ্চয়।’

আকলিমা তার বাবাকে জানালো, ‘আব্বু, আম্মু বলেছে, সে নাকি তোমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত!’ মোজাম্মেল স্যার চেয়ার টেনে বসলেন। তিনি বললেন, ‘আমি সব শুনেছি। এ কথা তোমাদের আম্মু সব সময়ই বলে। বাকি জীবন তাই বলে যাবে।’

মোজাফফর জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি কিছু বলো না?’ মোজাম্মেল স্যার নিজের থালায় ভাত নিতে নিতে বললেন, ‘কী বলবো? ঠিকই তো বলে তোমাদের আম্মু।’ তিনি যোগ করেন, ‘দুনিয়ার সব আম্মুরা আব্বুদের চেয়ে বেশি শিক্ষিতই হয়। তাই হতে হয় তাদের।’

পরী বানু খুশি হয়ে স্বামীর থালায় মাছের মাথাটা তুলে দিলেন। মোজাম্মেল স্যার মাছের মাথা বাটিতে রেখে বললেন, ‘না না পরী! তুমিই খাও ওটা। মাছের মাথা তোমারই খাওয়া দরকার।’ তিনি যোগ করেন, ‘তবে সবটুকু নয়। কিছু খেয়ে বাকিটা তিন সন্তানদের ভাগ করে দাও। আমাকে বাটির ওই ছোট টুকরাটা দিলেই খুশি হবো আমি। মাছের মাথা খাওয়া দরকার নেই আমার!’

পরী বানু ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘আমি ছোটবেলায় যা করেছি, ওদের দিয়ে তা–ই করাই। তুমি মাস্টার মানুষ। আমি তোমার ছ’।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...