আন্তর্জাতিকএলএনজি সংকট গভীর, স্পট বাজারে দাম বেড়েছে ৩৪ শতাংশ
এলএনজি সংকট গভীর, স্পট বাজারে দাম বেড়েছে ৩৪ শতাংশ
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি কার্গো সময়মতো না পাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ সংকট তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্পট বাজারে এলএনজির মূল্য ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
দেশে জ্বালানি সরবরাহের সংকট আরও গভীর হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো সময়মতো না পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক স্পট বাজারে এলএনজির মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা প্রয়োজনীয় গ্যাস আমদানিতে সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে।
পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি পাঁচ দফা দরপত্র এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহের জন্য মাত্র দুটি স্পট এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহকারীরা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি মূল্য প্রস্তাব করেছে।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলা সর্বশেষ দুটি স্পট কার্গো কিনেছে। এর মধ্যে ভিটল এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে একটি কার্গো কেনা হয় প্রতি এমএমবিটিইউ ২২ দশমিক ৩৫ মার্কিন ডলার দরে, যা ১৫-১৬ আগস্ট সরবরাহ করা হবে। বিপি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে কেনা হয়েছে আরেকটি কার্গো, যার মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ৬৬ মার্কিন ডলার এবং সরবরাহ ২-৩ আগস্ট নির্ধারিত।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ভিটল এশিয়ার কার্গোর জন্য প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। বিপি সিঙ্গাপুরের কার্গোর জন্য প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হবে। এর আগে ২৬-২৭ জুলাই টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড যে স্পট কার্গো সরবরাহ করেছিল, তার মূল্য ছিল প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। সর্বশেষ কেনা দুটি কার্গোর দাম আগেরটির তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস কর্তৃক বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমান 'স্থিতিশীল' থেকে 'নেতিবাচক' পর্যায়ে নামিয়ে আনা স্পট বাজারে মূল্য বৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাতারএনার্জি, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং, এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিংয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক সরবরাহকারীরা স্বাভাবিকভাবে এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ বর্তমান স্পট বাজারমূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে গ্যাস কিনতে পারত। বিদ্যমান বিক্রি ও ক্রয় চুক্তি (এসপিএ) অনুযায়ী প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির মূল্য প্রায় ১১ থেকে ১২ মার্কিন ডলার হওয়ার কথা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতারএনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং ও এক্সিলারেট এনার্জি 'ফোর্স মেজর' ঘোষণা করে নির্ধারিত কার্গো সরবরাহ স্থগিত রাখে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তি বাতিল হওয়ায় সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিংয়ের সরবরাহও বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিং আগের সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১১ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার দরে আবারও এলএনজি সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে বিষয়টি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সামিটের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি পুনরায় কার্যকর হলে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব, কারণ প্রতিষ্ঠানটি 'ফোর্স মেজর' ঘোষণা করেনি।
সরকার সম্ভাব্য গ্যাস ঘাটতি মোকাবিলায় চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্পট বাজার থেকে মোট ৩৮টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। গত ২০২৫ সালে স্পট বাজার থেকে আমদানি করা হয়েছিল মোট ৪৯টি কার্গো। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গত ২১ জুলাই দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটির কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ আরও কমে গেছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, ৩১ জুলাই দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ১৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর মধ্যে পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজির পরিমাণ ছিল ৫০০ এমএমসিএফডি। দুর্ঘটনার আগে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৪২ এমএমসিএফডি।
মতামত (0)