বাংলাদেশের কিংবদন্তি অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে।
বাংলাদেশের কিংবদন্তি অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রমজান মাসে ঢাকা থেকে সিলেট আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে আধুনিক পথে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।
সিলেট ও মৌলভীবাজারে আজ তার কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন ও সিলেটের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাইফুর রহমান বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে তার যোগদানের শর্ত ছিল সিলেটের উন্নয়ন।
আরিফুল হক চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, সিলেটের উন্নয়নে সাইফুর রহমানের মতো বিস্ময়কর অবদান আর কেউ রাখতে পারেননি। জেনারেল ওসমানী, এয়ার ভাইস মার্শাল মাহবুব আলী খান কিংবা স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য অবদান থাকলেও সাইফুর রহমানের কর্মকাণ্ডের কাছে সেগুলো ম্লান হয়ে যায়। সিলেটের মানুষের ভালোবাসার মাঝেই তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন।
১৯৯৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে এক ঐতিহাসিক জনসভায় এম সাইফুর রহমানের একান্ত প্রচেষ্টায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিলেট বিভাগ ঘোষণা করেন। তিনি ১৯৭৯, ১৯৯৪ এবং ২০০১ সালে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী এবং সরকারের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী হিসেবে অসাধারণ সাফল্যের দৃষ্টান্ত রেখেছেন।
জাতীয় সংসদে টানা ১২ বার বাজেট পেশ করে তিনি এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালুর মাধ্যমে তিনি স্থায়ী অবদান রেখেছেন। এক সময়ে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম সাইফুর রহমান এবং সৌদি আরবের তেলমন্ত্রী জাকি ইয়েমেনির নাম বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হতো।
আমেরিকাসহ বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা তাদের চিনতেন ও সম্মান করতেন। বিশ্বব্যাংকসহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দেশের উন্নয়নে তিনি অনন্য ও অসামান্য অবদান রেখেছেন।
এম সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা পরিষদে যোগদান করেন। পরে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ১৯৮২ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালে তিনি মৌলভীবাজার-৩ সংসদীয় আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপিতে দুঃসময়ে সাইফুর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সরকার তাকে গ্রেফতার করে।
সাত মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে তাকে রাজনীতিতে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে এম সাইফুর রহমান ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এম সাইফুর রহমান ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মৌলভীবাজার-৩ ও সিলেট-১ (সদর) সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দুটি আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সাইফুর রহমান ২০০১ সালে মৌলভীবাজার-৩ আসনটি ছেড়ে দেন।
ওই আসনে উপ-নির্বাচনে তার জ্যেষ্ঠপুত্র এম নাসের রহমান জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাইফুর রহমান ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ সময়ে বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মসূচি অনুমোদনে নিয়োজিত সর্বোচ্চ সরকারি সংস্থা জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বিকল্প চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অর্থনীতি ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটি, জাতীয় পরিসংখ্যান কাউন্সিল, বয়স্ক ভাতা পেনশন সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটি, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটি, প্রশাসনিক সংস্কার ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ১৯৮০-১৯৮২, ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, আইডিবি এবং ইফাদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার সুযোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল ইইসি, এসকাপ, কমনওয়েলথ, ইফাদ, আঙ্কটাড, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের বিভিন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, ইতালি, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, কানাডা, বেলজিয়াম, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, কলাম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সংলাপে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেন।
তিনি ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত বসনিয়া বিষয়ক ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। একই বছরের অক্টোবরে কার্টাহেনা, কলাম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর সরকার প্রধানদের সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। সাইফুর রহমান কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ১৯৯৮ সালের জুনে লন্ডনে অনুষ্ঠিত সংসদের বিরোধী দলের অধিকার ও দায়িত্ব বিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। জার্মানির বার্লিনে ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ১০২তম আইপিইউ সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন।
মতামত (0)