রাজনীতি

এমপিও শিক্ষকদের প্রার্থিতা বহাল চায় জামায়াত: ইসির সুপারিশকে বৈষম্যমূলক আখ্যা

এমপিও শিক্ষকদের প্রার্থিতা বহাল চায় জামায়াত: ইসির সুপারিশকে বৈষম্যমূলক আখ্যা
এমপিও শিক্ষকদের প্রার্থিতা বহাল চায় জামায়াত: ইসির সুপারিশকে বৈষম্যমূলক আখ্যা
জরুরি প্রয়োজনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন একীভূত ৫ ব্যাংকের গ্রাহকেরা জিয়াউর রহমান হত্যার অপ্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন ২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন একমাত্র সেনাবাহিনীর পক্ষে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি পুনঃস্থাপন সম্ভব: ড. ইফতেখারুজ্জামান ২০০৯ সাল থেকে ঢাবির শিক্ষকসহ সব নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত স

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখার জোর দাবি জানিয়েছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের কাছে এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তারা ইসির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ দুজন কমিশনারের সঙ্গে জামায়াতের একটি ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল এই বৈঠকে অংশ নেয়। বুধবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াত তাদের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার ইসির প্রাথমিক সুপারিশ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

ইসির সেই সুপারিশে বলা হয়েছে, যেসব এমপিওভুক্ত শিক্ষক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি বেতনের একটি অংশ পান, তারা নির্বাচনে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এর বিপরীতে জামায়াতের যুক্তি হলো, সংবিধান বা জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের বাদ দেওয়াটা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিয়মিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই ধরনের একটি সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। জামায়াত মনে করে, ইসির এই সুপারিশের পেছনে একটি ‘দুরভিসন্ধি’ থাকতে পারে।

দলটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক যেসব নিয়োগ দিয়েছে, তাদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির যুক্তি, এসব পদে থেকে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না এবং তা পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি করবে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিপন্থী। যেহেতু এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, তাই সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরা যেন কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা বা সভায় অংশ নিতে না পারেন, সে ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির লিখিত দাবিও জানিয়েছে দলটি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা চাকরি ছেড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, ইসি যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার পেছনে সরকারের হাত থাকতে পারে এবং এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। মিয়া গোলাম পরওয়ার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা অবৈধ হবে এবং সেক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও জামায়াত কঠোর সমালোচনা করেছে। মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, তিনি বিএনপির একটি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জামায়াতের মতে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা হওয়ায় এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচন নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। তাই অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।

দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আগেই প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাদ দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে ইসির সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে শামসুল আলমের নিয়োগের বিষয়সহ আরও কয়েকটি ব্যাপারে দলের অবস্থান কমিশনের কাছে তুলে ধরা হবে। জামায়াত অভিযোগ করেছে যে, অবসরের পরে ‘চিহ্নিত দলীয় ব্যক্তিকে’ ইসির অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে আজ্ঞাবহ করতে চায়।

এছাড়াও, রাজনীতি বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের পদে থাকা ব্যক্তিরা যেন কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছে দলটি। ২১ জুলাই নির্বাচন কমিশনের সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না রাখার সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। একই সভায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখাসহ আরও কয়েকটি সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

ইসির এই সুপারিশগুলো এখন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে যে এগুলো আমলে নেওয়া হবে কি না। যদি সরকার এসব সুপারিশ গ্রহণ করে, তাহলে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে, যা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে কার্যকর হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

এই বিতর্কটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একদিকে নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট পেশাজীবী গোষ্ঠীকে নির্বাচনে অযোগ্য করার সুপারিশ করছে, অন্যদিকে জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দল এটিকে সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী এবং বৈষম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করছে। এই পরিস্থিতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগের উপর গভীর প্রভাব ফেলবে।

অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ একটি স্বাভাবিক বিষয় ছিল, যা স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করতো। যদি এই সুপারিশ কার্যকর হয়, তবে এটি কেবল শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকারকেই সীমিত করবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের শূন্যতাও তৈরি করতে পারে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে যে, সরকার বা নির্বাচন কমিশন কি স্টেকহোল্ডারদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে এমন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এই মুহূর্তে ইসির সুপারিশগুলো সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে, যা ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণ করবে। এটি একটি বৃহত্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যে, একটি সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং তাদের সুপারিশগুলো কতটা জনবান্ধব। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যেখানে পেশাজীবী মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে।

এই ঘটনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায় যে, কোনো বড় নীতিগত পরিবর্তন আনার আগে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ও মতবিনিময় অপরিহার্য। এটি কেবল সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাই বাড়ায় না, বরং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এবং জন অসন্তোষও এড়াতে সাহায্য করে। ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...