আন্তর্জাতিকগাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অস্থিরতা
গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অস্থিরতা
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির পর গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জনমত ও রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস গাজা উপত্যকায় অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। এই নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে শুধু হামাসের জন্য নয়, ইসরায়েলের জন্যও কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলকে গাজা উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। ধাপে ধাপে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এসব শর্ত ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল ও দেশটির সংবাদমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েল সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা গত শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, হামাসের ‘প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ’ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে কোনো সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েল খুবই সন্তুষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ করা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা অন্য সব রাজনীতিকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ইসরায়েল যদি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি মেনে না চলে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘খুব, খুব হতাশ’ হবেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা থেকে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর অনেক ইসরায়েলি নাগরিক গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় যে যুদ্ধ চালিয়েছে, তাকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থা জাতিগত নিধন বলে উল্লেখ করেছে। গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই শিশু ও নারী। একই সঙ্গে গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
গত মে মাসে প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ইহুদি ইসরায়েলিদের ৮২ শতাংশ গাজায় ফিলিস্তিনিদের নিজ বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের পক্ষে। একই জরিপে আরও দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরও তাঁদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের পক্ষে মত দিয়েছেন। এক মাস পর প্রকাশিত আরেক জনমত জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী ইহুদিদের ৬৪ শতাংশের বিশ্বাস, গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ‘কোনো নিরপরাধ মানুষ নেই’।
ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রীরাসহ অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিক বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ ইহুদি বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, একই ধরনের বসতি শিগগিরই গাজায়ও স্থাপন করা হবে। এ কারণে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং উপত্যকাটির পুনর্গঠনের উদ্যোগ অনেক ইসরায়েলির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ঘোষণার পরপরই দেশটির বিভিন্ন রাজনীতিক এর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই চুক্তিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বেন গভির লিখেছেন, হত্যাকারীদের (হামাস) লক্ষ্য করে অভিযান বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অর্থ, হামাসকে পরবর্তী জাতিগত নিধনের জন্য নিজেদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। তিনি আরও বলেন, গাজায় লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে, ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করতে হবে এবং ইসরায়েলকেই জয়ী হতে হবে। ইসরায়েলের ‘এলাকা ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করা’ কথাটিকে ব্যাপকভাবে জাতিগত নির্মূলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।
ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের মতো মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত রাজনীতিকেরাও এই চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আইজেনকোট বলেন, যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে যেকোনো চুক্তি করা হলে তা হবে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থতা’। তিনি লিখেছেন, ৭ অক্টোবরের (২০২৩ সাল) সেই সকাল থেকে প্রায় তিন বছর কেটে গেছে। অথচ (ওই বছরের) ৬ অক্টোবরের সন্ধ্যায় হামাসের যেসংখ্যক সশস্ত্র সদস্য ছিলেন, এখন তারা আবার প্রায় একই সংখ্যায় নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
মতামত (0)