অর্থনীতি

গ্যাস খাতে রেকর্ড ঘাটতি: সংকটে পেট্রোবাংলা

গ্যাস খাতে রেকর্ড ঘাটতি: সংকটে পেট্রোবাংলা
গ্যাস খাতে রেকর্ড ঘাটতি: সংকটে পেট্রোবাংলা
উচ্চ আমদানি খরচ ও কম বিক্রয়মূল্যের কারণে দেশের গ্যাস খাত রেকর্ড পরিমাণ আর্থিক সংকটে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা ঘাটতি আরও বাড়িয়েছে।

গ্যাস আমদানিতে উচ্চ ব্যয়ের কারণে দেশের গ্যাস খাত মারাত্মক আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১১৭ টাকা খরচ হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রণের পর এই খরচ গড়ে ৫২.১৮ টাকায় দাঁড়াচ্ছে, যা জুলাই থেকে নভেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী।

গড় ২৩.৯০ টাকা দরে গ্যাস বিক্রি করায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। অক্টোবর মাসে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলা ধারণা করছে, নভেম্বর মাসে এই ঘাটতি আরও ৬ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই মোট ২৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। স্পট মার্কেট থেকে এক কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার ও ওমান থেকে জিটুজি ভিত্তিতে গ্যাস আসা বন্ধ থাকায় লোকসান বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি মাসে একটি জাহাজ হরমুজ পার হতে পারায় সেটি দ্রুত সংগ্রহ করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এক কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ হলেও, এখন সেই কার্গো সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। পূর্বে যে পরিমাণ গ্যাস ১০ ডলারে পাওয়া যেত, এখন তা ২২ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে।

ঘাটতি মেটানোর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করে আব্দুল মান্নান বলেন, জ্বালানি একটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য, এটি সরবরাহ না করার কোনো সুযোগ নেই। পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ২৭.৬৪ টাকা।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য ৪৫.৭৯ টাকায় পৌঁছায়। ওই সময়ে গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকা থাকায় প্রতি ঘনমিটারে ২১.৮২ টাকা ঘাটতি হয়। এতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছিল।

চলতি অর্থবছরের জন্য জ্বালানি খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে মন্ত্রণালয় সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। পেট্রোবাংলা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব দেয়।

এই প্রস্তাবনা এমন সময়ে দেওয়া হয় যখন এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছিল। সংকটের মধ্যে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে প্রক্রিয়াটি আপাতত স্থগিত করা হয়।

পেট্রোবাংলা বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি ঘনমিটারের জন্য ১ টাকা এবং বাপেক্সকে ৪ টাকা দেওয়া হয়। শেভরন বাংলাদেশকে প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৭৬ ডলার (প্রায় ১২ টাকা) এবং টাল্লোকে প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৩১ ডলার (প্রায় ১০ টাকা) হারে দাম দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.৬৬ ডলার (প্রায় ৪৬ টাকা) এবং ওমান থেকে আনা এলএনজির দাম প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.০৯ ডলার (প্রায় ৪৪ টাকা) পড়েছে। দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা।

৩০ শতাংশ আমদানির পর এই মূল্য ৫২.১৮ টাকায় দাঁড়াচ্ছে। ৩০ শতাংশ আমদানিতে ভর্তুকি সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় যখন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি ছিল, তখন আমদানিনির্ভরতা বর্তমান মহাসংকটের কারণ।

দ্বীপ জেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস আনার জন্য ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার (ভোলা-বরিশাল) পাইপলাইন প্রকল্প আটকে আছে। একই সময়ে, ২৪ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির জন্য মহেশখালী-বাখরাবাদ সমান্তরাল পাইপলাইন প্রকল্প দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ফেনী-বাখরাবাদ অংশের ঠিকাদার নিয়োগের কাজও প্রায় চূড়ান্ত।

ছন্দহীন কূপ খননের ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়াও আটকে রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন ধাপে প্রায় ১৯টি ডিপিপি আটকে আছে। বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ডিপিপি অনুমোদিত হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কারণে জিডিএফ অর্থায়ন প্রকল্পও এক প্যাঁচে আটকে পড়েছে। মন্ত্রী স্বয়ং চিঠি দিলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানান, তিনি আজ সশরীরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন এ বিষয়ে কথা বলতে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...