অর্থনীতি

এলপিজি বাজারে কৃত্রিম সংকট, আমদানিকারকদের তথ্যেও গরমিল

এলপিজি বাজারে কৃত্রিম সংকট, আমদানিকারকদের তথ্যেও গরমিল
এলপিজি বাজারে কৃত্রিম সংকট, আমদানিকারকদের তথ্যেও গরমিল
এলপি গ্যাসের বাজারে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও আমদানিকারকদের দেওয়া বিক্রির হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। বিইআরসি তথ্য যাচাই করছে।

এলপি গ্যাসের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং খোদ আমদানিকারকদের দেওয়া বিক্রির হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং কোম্পানিভেদে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তাদের কাছে দাখিলকৃত এলপিজি বিক্রির পরিসংখ্যানে এই তথ্য পেয়েছে। বিইআরসির একাধিক কর্মকর্তা এই বিক্রির তথ্যকে মোটেই সন্তোষজনক মনে করছেন না। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রাপ্ত উপাত্তে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যথেষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান।

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিইআরসি সেপ্টেম্বর মাসের এলপিজির বেচাকেনার তথ্য চেয়ে ১২ জন আমদানিকারককে চিঠি পাঠিয়েছিল। গত ৪ অক্টোবরের মধ্যে ১১টি কোম্পানি তাদের তথ্য জমা দিয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, তারা তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করছেন। তথ্যে কোনো গরমিল বা সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে সে বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি এখনই বলার মতো সময় আসেনি, যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

যদি কারো তথ্যে সন্দেহ হয়, তাহলে সরেজমিন পরিদর্শনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে বিইআরসি চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন।

বিইআরসির একটি সূত্র জানিয়েছে, যমুনা এলপিজি, ওমেরা এলপিজি, টিএমএসএস এবং বিএম এলপিজিসহ কয়েকটি কোম্পানির তথ্যে ব্যাপক গরমিল দেখা গেছে। যমুনা স্প্রেসটেক জেভি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে দৈনিক ১ হাজার থেকে ১৬০০ টন পর্যন্ত সরবরাহ দিলেও ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তা কমিয়ে দেয়। ২৮ সেপ্টেম্বর তারা মাত্র ২৪০ টন সরবরাহ করেছে।

টিএমএসএস এলপিজিও তাদের সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। কোম্পানিটি ১৭ সেপ্টেম্বর ২৪১ টন সরবরাহ দিলেও ২৭ সেপ্টেম্বর সরবরাহ করেছে মাত্র ৪৬ টন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কোম্পানিগুলোর দেওয়া এই তথ্যও যথাযথ নয়। তারা দাবি করেছেন, বিইআরসিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য গোজামিল দিয়ে হিসাব দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন তদন্ত, তাদের বিক্রির লেজার এবং ব্যাংকের তথ্য পরীক্ষা করলেই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়বে।

সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এলপি গ্যাসের সংকটের সূত্রপাত হয়। একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ঊর্ধমুখী (টনপ্রতি ৬৪ ডলার) হওয়ায় পাঁচটি কোম্পানি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন দামে বিক্রি করার জন্য তারা হাজার হাজার টন এলপিজি মজুদ করে রেখেছে।

ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সে কারণে বাজারে ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

শুধু সরবরাহ কমানো নয়, সেপ্টেম্বর মাসে বিইআরসি ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির লিখিত অভিযোগ করেছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনটি ২১ সেপ্টেম্বর বিইআরসি চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া অভিযোগে বলেছে, পরিবেশকদের জন্য বিইআরসি নির্ধারিত দর (১২ কেজি) ১৪৭৫ টাকা হলেও তাদের ১৫৫০ টাকা থেকে ১৭২০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে।

এ কারণে বিইআরসি নির্ধারিত ভোক্তা দর ১৫৮৫ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সমিতি উল্লেখ করেছে।

পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা এমনকি গোয়েন্দা তথ্যেও এলপিজি অবৈধ মজুদের বিষয়টি সামনে এলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হলেও তার সুফল দৃশ্যমান হয়নি।

আমদানিকারকরা কোনো পদক্ষেপ ছাড়াই অক্টোবর মাসে পৌঁছে গেছে। গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজিতে ২৫২ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এরপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না।

একজন অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশনের মালিক জানিয়েছেন, তার বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। মাসে তার প্রায় ১৫০ গাড়ির মতো গ্যাস প্রয়োজন হলেও সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মাত্র ১৪ গাড়ির সরবরাহ পেয়েছেন। গত ৪ অক্টোবর অনেক অনুরোধের পর তিনি মাত্র ১ গাড়ি গ্যাস পেয়েছেন, যেখানে তার কমপক্ষে ৬ গাড়ি অটোগ্যাস প্রয়োজন ছিল।

ওই মালিক আরও বলেন, গত ৪ অক্টোবর ১ গাড়ি গ্যাস দেওয়া হলেও তার নাম প্রকাশ করলে পরবর্তীতে গ্যাস না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন পরিচালন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল মওলা বলেছেন, এখনও চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশের মতো সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। অনেক কোম্পানি বাড়তি দাম আদায় করছে বলেও তিনি জানান।

অতীতে যখনই দাম ঊর্ধমুখী হয়েছে তখনই ব্যবসায়ীরা নানান কারসাজি করেছে। এবারও অক্টোবর মাসে দাম বাড়ার আভাস পেয়ে সরবরাহ কমিয়ে দিলে বাজারে চরম সংকট দেখা দেয়। ১৫৮৫ টাকার এলপিজি ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...