আন্তর্জাতিকহাইতিতে সশস্ত্র গ্যাংয়ের হামলায় ৪৭ জন নিহত, নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ
হাইতিতে সশস্ত্র গ্যাংয়ের হামলায় ৪৭ জন নিহত, নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ
হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের কাছে কেন্সকফ এলাকায় রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তা দিতে পুলিশের ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ক্যারিবীয় দেশ হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের কাছে কেন্সকফ এলাকায় রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২২ জন। সোমবার (২৪ আগস্ট) জাতিসংঘের হাইটি বিষয়ক ইন্টিগ্রেটেড অফিস এই তথ্য জানিয়েছে।
জাতিসংঘ আরও জানায়, হতাহত মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে। হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা গেছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশ স্টেশন থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করা হলেও পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
হাইতির মানবাধিকার সংগঠন আরএনডিডিএইচ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই হামলা শুরু হয়। তাদের হিসাবে, ৩০ থেকে ৪০ জন নিহত এবং ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছেন। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় হতাহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
কেন্সকফ একটি পাহাড়ি এলাকা এবং হাইতির রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথের কাছে অবস্থিত। গত বছর থেকে সশস্ত্র গ্যাংগুলো এই এলাকায় প্রায় এক ডজন হামলা চালিয়েছে। এসব সহিংসতার কারণে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের শুরুতে টানা দুই মাস কেন্সকফে গ্যাং হামলায় ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ওই সময়ে প্রায় ২০০টি বাড়ি ধ্বংস বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, তখন প্রায় ৩ হাজার মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
পরবর্তী সময়েও কেন্সকফে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হত্যা ছাড়াও ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও গবাদিপশু চুরির মতো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে শক্তিশালী গ্যাং জোটগুলো পোর্ট-অ-প্রিন্স ও আশপাশের এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করেছে।
হাইতি সরকার এই হামলাটিকে ‘জঘন্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তারা নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকার পুলিশপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাছাকাছি অবস্থান করেও হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানায়, কেন্সকফকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হবে না। কোনো ধরনের দুর্বলতা বা বিলম্ব ছাড়াই সেখানে সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।
হামলার পর রাস্তায় রক্তমাখা চাদরে ঢাকা এক আত্মীয়ের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কোরিওলান কেন্ডি বলেন, তার পরিবারও এই সহিংসতার শিকার। কেন্সকফের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন এবং এর দায় সরকারের বলে তিনি অভিযোগ করেন। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ওরিসমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, এলাকার মানুষ অপমান ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটালেও তাদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হামলার সময় বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জ্যঁ উইলিয়াম পাপের বাড়িও রয়েছে। পরে কেন্সকফ পরিদর্শনে গিয়ে দেশটির জাতীয় পুলিশপ্রধান ভ্লাদিমির প্যারাজন সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ কখনো হাল ছেড়ে দেয়নি।
নতুন করে এই সহিংসতা আগামী ডিসেম্বরে হাইতিতে নির্বাচন আয়োজন নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে দেশটিতে এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে গ্যাংগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে এর আগে কয়েকটি সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
জাতিসংঘের সমর্থনে গঠিত গ্যাংবিরোধী বাহিনীকে হাইতির পুলিশকে সহায়তা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে কেন্সকফে নিরাপত্তা জোরদারে বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
১৮০৪ সালে হাইতি লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দেশটি আগে স্পেন ও পরে ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বিশ্বে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বাধীন স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানে।
তবে স্বাধীনতার পর দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে হাইতি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, আগ্রাসন ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির ইতিহাসে দুভেলিয়ার পরিবারের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনও অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
মতামত (0)