গত সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে রেকর্ড ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে।
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে গত সোমবার রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়েছে। ওই দিন ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রণালিটি পার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি সেক্রেটারি ক্রিস রাইট এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাইট জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে স্বাভাবিক সময়ে ওই অঞ্চল থেকে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হতো, গত সোমবারে জ্বালানি তেল রপ্তানির পরিমাণ সেই মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন যুক্ত করলেও এই চিত্র দেখা যায়। যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে এতো বেশি জ্বালানি তেল পরিবহন করা হলো।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহন করা হতো। এটি বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবহন করা মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে হামলা, সমুদ্রসীমায় মাইন পেতে রাখার আশঙ্কা এবং অতিরিক্ত বিমা মাশুলের কারণে এই পথে চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়। চলতি সপ্তাহে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সৌদি আরবের দুটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে প্রণালি থেকে বের হওয়ার সময় হামলা চালানো হয়।
এর ফলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর মধ্যে সমুদ্রে মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা ও সামুদ্রিক সামরিক স্থাপনাও ছিল। জবাবে ইরানও এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি আবারও ব্যাহত হওয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি দিয়ে রেকর্ড জ্বালানি তেল পরিবহনের দাবি করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ কমেনি। গতকাল শুক্রবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেঞ্চ ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলার ৩৮ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) দাম ৯০ ডলার ৯৩ সেন্টে লেনদেন হয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ছয় মাস ধরে বিপরীতমুখী দাবি চলছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের দাবি করে বলেছেন, প্রতি রাতে প্রায় ৩০টি জাহাজকে হরমুজ পার হতে সহায়তা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। তিনি আরও বলেন, জলপথটি এখন ‘যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার হরমুজ দিয়ে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে।
ইরান স্বীকার করেছে যে, কিছু জাহাজ হরমুজ পার হচ্ছে। তবে তারা বলছে, জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত মঙ্গলবার বলেন, ‘শত্রুপক্ষ কিছু জাহাজ পার করাতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু হরমুজ এখনো আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।’
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি পথ ব্যবহার করার ‘ভুয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ দিচ্ছে। পরদিন বুধবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস দাবি করে, ‘অবৈধ পথ’ ব্যবহার করতে গিয়ে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার মাইন বিস্ফোরণে অচল হয়ে গেছে। একই সময়ে সৌদি আরব অভিযোগ করেছে, একটি সৌদি ট্যাংকারে ইরানের হামলায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন।
জাহাজ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে মিলছে না। সামুদ্রিক ডেটা বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার হরমুজ অতিক্রম করেছে মাত্র ৬টি জাহাজ, গত মঙ্গলবার ১১টি এবং গত সোমবার ৫টি। গত ১০ দিনে গড়ে দৈনিক হরমুজ অতিক্রম করেছে মাত্র ১৩টি জাহাজ।
লন্ডনভিত্তিক শিপিং-বিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সও প্রায় একই চিত্র দিয়েছে। তাদের হিসাবে, ২৬ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দৈনিক গড়ে প্রায় ১২টি কার্গো জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র গত ১ সেপ্টেম্বরের তথ্য বলেছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল এখনো স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।
তবে সাম্প্রতিক নিম্ন অবস্থান থেকে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সঙ্গে তারা ভাসমান বা অচিহ্নিত মাইনের কারণে ঝুঁকির মাত্রা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাহাজ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানের হিসাবের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়াই বড় কারণ হতে পারে। লয়েডস লিস্টের সামুদ্রিক গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ব্রিজেট ডিয়াকুন বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান কেবল ১০ হাজার ডেডওয়েট টনের বেশি কার্গোবাহী জাহাজ গণনা করে।
বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো টাগবোট, ছোট উপকূলীয় নৌযান, অফশোর সাপোর্ট ভেসেল ও নৌবাহিনীর সহায়ক জাহাজও হিসাবের মধ্যে রাখছে। ড্রুরি মেরিটাইম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এরিক হুপার জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে স্যাটেলাইট, বিমান ও অন্যান্য সেন্সরের তথ্য এবং নিজেদের কনভয়ের তালিকা থাকে। ফলে তারা এমন অনেক জাহাজ শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করে।
এরিক হুপার জানান, আগস্টের শেষ দিকে হরমুজ অতিক্রমকারী অধিকাংশ জাহাজই ‘ডার্ক ট্রানজিট’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত ছিল। অর্থাৎ তারা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় তাৎক্ষণিকভাবে ট্র্যাকিং ডেটায় ধরা পড়েনি। পরে তথ্য হালনাগাদ হলে তাদের চলাচল যুক্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষেরই হরমুজে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে দেখানোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি এনশার বলেন, দুই পক্ষই যদি কিছুটা কম কথা বলত, তাহলে পরিস্থিতি সবার জন্যই ভালো হতো। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ এবং প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে যেত।
মতামত (0)