ধর্মইমাম আওজায়ি: আব্বাসীয় সেনাপতির সামনে আপসহীন ফতোয়া
ইমাম আওজায়ি: আব্বাসীয় সেনাপতির সামনে আপসহীন ফতোয়া
আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে আলীর সামনে নির্ভীক ফকিহ ইমাম আওজায়ি (রহ.) উমাইয়া শাসকদের উৎখাত ও রক্তপাতের বিষয়ে সত্যের পক্ষে অটল অবস্থান নেন।
এক থমথমে, শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা নেমে এসেছিল দরবারে। মসনদে উপবিষ্ট ছিলেন ক্ষমতাধর আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে আলী, যাঁর হাতে ছিল একটি উদ্যত বাঁশের লাঠি। চারপাশে উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে ছিল জল্লাদ ও সশস্ত্র প্রহরীরা।
এমন ভীতিকর পরিবেশে সামান্য একটি ভুল শব্দও অবধারিত মৃত্যুদণ্ড ডেকে আনতে পারত। কিন্তু সেই রক্তচক্ষুর সামনে যাঁকে হাজির করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন নির্ভীক ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম আওজায়ি (রহ.)। তাঁর কাছে সত্য ছিল আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত, কোনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নয়।
সেনাপতি গর্জে উঠে প্রশ্ন করলেন, উমাইয়া শাসকদের উৎখাত করে আব্বাসীয়দের ক্ষমতা দখল ও রক্তপাতের বিষয়ে তাঁর মত কী। ইমাম আওজায়ি (রহ.) একবিন্দু কাঁপলেন না। তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে সত্যের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরাসরি নবীজির হাদিস উচ্চারণ করলেন।
শামের অবিসংবাদিত ইমাম, হাদিস ও ফিকহের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে তিনি পরিচিত। বহু বছরের পরিশ্রমে সংগৃহীত কিতাব চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেলেও তাঁর জ্ঞানসাধনা থমকে যায়নি। কারণ তাঁর জ্ঞানের মূল আধার কাগজের পাতার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত ছিল তাঁর স্মৃতি ও অন্তরে।
ইমাম আওজায়ি (রহ.)-এর মূল নাম ছিল আবদুর রহমান ইবনে আমর এবং পারিবারিক নাম ছিল আবু আমর। ৮৮ হিজরিতে বর্তমান লেবাননের বা‘লাবাক্কা (বালবেক) অঞ্চলে এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে তিনি এতিম হয়ে পড়েন।
চরম অভাব-অনটনের মধ্যে তাঁর মা তাঁকে নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোনো পার্থিব আরাম-আয়েশ বা অনুকূল পরিবেশ তাঁর ছিল না। মহান আল্লাহ প্রতিকূলতার কণ্টকাকীর্ণ পথেই বড় বড় মনীষী গড়ে তোলেন।
শৈশবে একদিন সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলার সময় এক প্রভাবশালী আরব ব্যক্তিত্ব সেখানে আসেন। তাঁকে দেখে অন্য শিশুরা ভয়ে পালিয়ে গেলেও কিশোর আওজায়ি (রহ.) নির্ভীক চিত্তে স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই প্রবীণ ব্যক্তি তাঁর চোখের আত্মবিশ্বাস ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব লক্ষ করে তাঁকে নিজ আশ্রয়ে নিয়ে যান।
পরবর্তী সময়ে তিনি এক কাফেলার সঙ্গে ইয়ামামায় প্রেরিত হন। এই সফরই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইয়ামামায় তাঁর সাক্ষাৎ হয় তৎকালীন প্রখ্যাত তাবেয়ি ও হাদিসবিশারদ ইয়াহইয়া ইবনে আবু কাসিরের সঙ্গে।
একদিন মসজিদে কিশোর আওজায়ি (রহ.)-কে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়তে দেখে ইয়াহইয়া মুগ্ধ হন এবং তাঁর খোঁজখবর নেন। কিশোরের ভেতরের জ্ঞানের সুপ্ত প্রতিভা আঁচ করতে পেরে তিনি তাঁকে নিজ জ্ঞানমজলিসে স্থান দেন। ইমাম আওজায়ি (রহ.) পার্থিব কাজের ব্যস্ততা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ইলমের সাধনায় সঁপে দেন।
তিনি ইয়াহইয়া ইবনে আবু কাসিরের কাছ থেকে এত বিপুল পরিমাণ হাদিস ও ফিকহের পাঠ লিপিবদ্ধ করেছিলেন যে প্রায় ১৩-১৪টি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাঁর সেই অমূল্য সব লিখিত পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে যায়।
শিক্ষকের পরামর্শে তিনি আরও গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বসরার পথে পা বাড়ান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম হাসান বসরি ও মুহাম্মদ ইবনে সিরিনের সান্নিধ্য লাভ করা। কিন্তু বসরায় পৌঁছে তিনি জানতে পারেন হাসান বসরি (রহ.) ইন্তেকাল করেছেন এবং ইবনে সিরিন (রহ.) মৃত্যুশয্যায় ছিলেন।
তিনি কিছুদিন ইবনে সিরিনের (রহ.) সেবায় নিয়োজিত থাকেন, কিন্তু জ্ঞানপিপাসা মেটানোর আগেই তিনিও ওফাত বরণ করেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষা না পেয়েও তিনি দমে যাননি। তিনি মক্কা, মদিনা ও শামে সফর করে জ্ঞান অর্জন করেন।
আতা ইবনে আবি রাবাহ, কাতাদাহ, ইমাম জুহরি এবং নাফের মতো যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের দরবারে বসে তিনি জ্ঞানের সমুদ্রে অবগাহন করেন। ইমাম আওজায়ি (রহ.)-এর মেধা ও জ্ঞানের গভীরতা এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তৎকালীন উম্মাহর নামজাদা আলেম ও সাধারণ মানুষ তাঁর কাছে ধর্মীয় সমাধানের জন্য ফতোয়া চাইতে শুরু করেন।
এরপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি অবিরাম ফতোয়া ও হেদায়েতের আলো বিলিয়ে গেছেন। শ্রুতি আছে, তাঁর মাধ্যমে সমাধান হওয়া ফিকহি মাসআলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার। পরবর্তী যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা তাঁর দরসে ছাত্র হিসেবে ধন্য হয়েছেন।
সুফিয়ান সাওরি, ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম এবং ইসমাইল ইবনে আইয়াশের মতো দিকপাল আলেমরা তাঁর কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহের ইলম অর্জন করেছেন। ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে ইমাম আওজায়ি (রহ.) শুধু একজন বড় মুহাদ্দিসই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন স্বতন্ত্র মুজতাহিদ এবং একটি প্রতিষ্ঠিত ফিকহি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা।
হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে গোটা সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন তথা সমগ্র শাম অঞ্চলে এবং মুসলিম স্পেনে (আন্দালুস) দীর্ঘকাল তাঁর ফিকহি মাজহাব রাষ্ট্র ও সমাজে প্রধান মাজহাব হিসেবে প্রচলিত ছিল।
মতামত (0)