ধর্মকোরআনের উপমায় আমল: পাথরের মাটি ও উর্বর বাগানের দৃষ্টান্ত
কোরআনের উপমায় আমল: পাথরের মাটি ও উর্বর বাগানের দৃষ্টান্ত
কোরআনে মানবীয় আমলকে পাথরের মাটি ও উর্বর বাগানের উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা লোকদেখানো ও নিষ্ঠাপূর্ণ দানের ফলাফল তুলে ধরে।
ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনে বুদ্ধি খাটানো এবং গভীর চিন্তাভাবনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রাণপ্রকৃতিকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করে নিবিড়ভাবে চিন্তা করার ইশারা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আয়াতসমূহে কিছু উপমা ব্যবহার করে মানবীয় কর্মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।
লোকদেখানো দানের একটি উপমা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দানকে নষ্ট করে দিয়ো না; ওই লোকের মতো যে নিজের ধন লোকদেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে ইমান রাখে না। ফলে তার উপমা হলো এমন একটি মসৃণ পাথর, যার ওপর কিছু (আলগা) মাটি থাকে, তারপর প্রবল বৃষ্টি সেটাকে (ধুয়েমুছে) সাফ করে ফেলে। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগানোর ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।" (সুরা বাকারা, আয়াত ২৬৪)
এই উপমার মাধ্যমে একটি অদৃশ্য মানবিক অবস্থাকে দৃশ্যমান করে তোলা হয়েছে। যারা দান করার পর সেই দানের কথা বলে বেড়ায় বা দানগ্রহীতাকে কষ্ট দেয়, আল্লাহর কাছে তাদের দানের কোনো মূল্য নেই। এই দান মসৃণ পাথরের ওপর জমে থাকা আলগা মাটির মতোই, যা প্রথম দেখায় উর্বর মনে হলেও প্রবল বৃষ্টিতে সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। এই শ্রেণির দানকারীরা দুনিয়া ও আখিরাতে কোনো ফল পাবে না।
অপরদিকে, নিষ্ঠাপূর্ণ দানেরও উপমা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ও নিজেদের মনে (ইমানের) দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা কোনো উচ্চভূমিতে অবস্থিত একটি বাগানের মতো, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে সেথায় ফলমূল দ্বিগুণ জন্মে। আর যদি মুষলধারে বৃষ্টি না–ও হয়, তবে অল্প বৃষ্টিই যথেষ্ট। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।" (সুরা বাকারা, আয়াত ২৬৫)
এই উপমা আগের আয়াতের বিপরীত দিক উপস্থাপন করে। উর্বর উঁচু ভূমিতে মুষলধারে বৃষ্টি পড়লে যেমন দ্বিগুণ ফসল হয়, তেমনি অল্প বৃষ্টিতেও মাটির উর্বরতার কারণে ফসল উৎপাদনে খুব একটা হেরফের হয় না। যে ব্যক্তি আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য দান করে, তার দান কখনোই বৃথা যায় না। নিষ্ঠার সঙ্গে বেশি দান যেমন তার প্রতিদানকে বহুগুণে উন্নীত করে, তেমনই অল্প দানও ভালো ফলাফল বয়ে আনে। এই চিত্রকল্প স্পষ্ট করে যে দানের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে অন্তরের অবস্থার ওপর, যা সব আমলের ক্ষেত্রে নিয়ত বা উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করার শর্ত দেয়।
মানুষে মানুষে বৈচিত্র্যের বিষয়েও কোরআনে উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূখণ্ড, আঙুরের বাগান, শস্যক্ষেত্র, একই মূল থেকে উদ্গত বা ভিন্ন ভিন্ন মূল থেকে উদ্গত খেজুরগাছ—যেগুলো একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়, আর স্বাদ-রূপের ক্ষেত্রে সেগুলোর কিছুসংখ্যককে আমরা কিছুসংখ্যকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এমন জাতির জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে—যারা মস্তিষ্ক খাটায়।" (সুরা রাদ, আয়াত ৪)
একই মাটি থেকে রস আস্বাদন করে, একই সূর্য থেকে শক্তি গ্রহণ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষ একই মূল থেকে উদ্গত হয়েও যেমন প্রতিটি গাছ আলাদা ও তাদের একেক ফলের একেক স্বাদ; মানুষে মানুষে পার্থক্যটাও একই রকম। কেউ সত্য ও সততার পথে নিজেকে আলাদা করে, আবার কেউ অসততা ও অন্যায়ের মধ্য দিয়ে ঠিক তা-ই করে। একই পরিস্থিতিতে পড়ে কেউ নিজেকে ধৈর্যশীল ও শোকরগুজার বানিয়ে আল্লাহর দিকে এগিয়ে নেয়, আবার কেউ নিজেকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়। মানুষের এই পার্থক্য শুধু তার বাহ্যিক গঠন, বংশ বা পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে নয়; বরং তার ভেতরের গুণাবলি ও কর্মের মধ্যেও।
মতামত (0)