খেলাধুলাইমরান খানকে জেলের ভেতরেই মেরে ফেলার শঙ্কা দুই ছেলের
ইমরান খানকে জেলের ভেতরেই মেরে ফেলার শঙ্কা দুই ছেলের
ইমরান খানের দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান তাঁদের বাবাকে জেলের ভেতরেই মেরে ফেলার গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বাবার শারীরিক অবস্থা ও কারাবাসের কঠোর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের এক শান্ত পরিবেশে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার জেমিমা গোল্ডস্মিথের বাড়িতে বসবাস করছেন তাঁর দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান খান। বিকেলের মনোরম আবহাওয়ার মধ্যেও তাঁদের মন পড়ে আছে পাঁচ হাজার মাইল দূরের রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে। সেখানেই বন্দী রয়েছেন তাঁদের বাবা, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
৭৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেট কিংবদন্তি বর্তমানে এক ছয় বাই আট ফুটের নির্জন সেলে আটক রয়েছেন। রক্ত জমাট বাঁধার কারণে তাঁর এক চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। কারাগারে পান করার জন্য ন্যূনতম পরিষ্কার পানিও নেই, আছে কেবল পচা দূষিত জল।
ইমরান খানের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অমানবিক বন্দিদশার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের ওপর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ ক্রমশ বাড়ছে। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা এবং উস্টারশায়ার ও সাসেক্সে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার কারণে ব্রিটেনে তাঁর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টের প্রথম দিনে স্কাই স্পোর্টসে ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা নিয়ে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে।
ক্ষোভে পাকিস্তান দল দুপুরের বিরতির পর মাঠে নামতেই অস্বীকৃতি জানিয়ে বসেছিল। ২৭ বছর বয়সী ছোট ছেলে কাসিম এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “ওরা নিজেদের পুরোপুরি গর্দভ বলে প্রমাণ করেছে।” ২৯ বছর বয়সী বড় ছেলে সুলাইমান এ প্রসঙ্গে তাঁর বিষণ্ন বিরক্তি প্রকাশ করেন।
সুলাইমান বলেন, "একটা প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু তাই বলে মাঠে না নামার হুমকি দেওয়ার মতো বোকামি করবে, তা ভাবিনি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানের হয়ে খেলা এবং ২২ বছর ইংল্যান্ডে থাকা একজন সাবেক খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার তুলে নেওয়ার কথা বলার এখতিয়ার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের থাকা উচিত নয়। সুলাইমান জোর দিয়ে বলেন, এই বিষয়টি কোনো রাজনীতি ছিল না, এটি ছিল পুরোপুরি মানবিক অধিকার এবং তাঁর স্বাস্থ্যের ব্যাপার।
মিথ্যা ও সাজানো দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ইমরান খানের ওপর চলা নির্মমতার মাত্রা দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যে সেলে তাঁকে রাখা হয়েছে, তা সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের জন্য নির্দিষ্ট। কারাগারের পানির মান এতটাই জঘন্য যে শত শত সহ-বন্দী হেপাটাইটিসে আক্রান্ত।
ইমরান খানকে পবিত্র কোরআন ছাড়া আর কোনো বই পড়তে দেওয়া হয় না। তাঁকে দিনে ২৩ ঘণ্টাই নির্জন কারাবাসে রাখা হয়। অথচ জাতিসংঘের নিজস্ব বিধিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, টানা ১৫ দিন কাউকে এভাবে নির্জন কারাবাসে রাখাটা সরাসরি নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে।
কাসিম পাকিস্তান সরকারের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সংশয় প্রকাশ করেননি। তিনি সরাসরি বলেন, "ওরা স্পষ্টতই তাঁকে ভেতরেই মেরে ফেলতে চায়।" কাসিম আরও যোগ করেন যে, সরকার নীরবে তাঁকে স্তব্ধ করে দিতে চায়, যেন মানুষ ধীরে ধীরে তাঁকে ভুলে যায়। তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষটাকে নিয়ে এমনটা করা সহজ নয়।
কাসিম ব্যাখ্যা করেন, যখনই তাঁদের কথা হয়, তাঁরা বুঝতে পারেন সরকারের কৌশল কী। তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো জল ঘোলা করে সময় ক্ষেপণ করা এবং এরপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে তাঁর বেঁচে থাকাটাই অসম্ভব করে তোলা। সুলাইমান তাঁদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয়টি খোলাসা করেন।
সুলাইমান জানান, তাঁরা সবচেয়ে দুশ্চিন্তার যে তত্ত্বটা শুনছেন তা হলো, সরকার নাকি ইচ্ছা করেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির খবরগুলো একটু একটু করে প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন ওরা তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। আসলে ভেতরে ভেতরে আরও মারাত্মক কিছুর পটভূমি তৈরি করা হচ্ছে।
সুলাইমান আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সরকার একদিন বলতে পারে, একজন বয়স্ক মানুষ মরে গেছে, এতে তাদের কী করার আছে। ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে বাবাকে জেল থেকে ছাড়ানোর সাহায্য প্রসঙ্গে কাসিম খান বলেন, কর্তৃপক্ষ তাঁদের সরাসরি বলেছে তাঁরা যেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে না যান। এমনকি তাঁরা যদি পাকিস্তানে যান এবং সেখানে গ্রেপ্তার বা আটক হন, তাহলে কোনো সহায়তা দেওয়া হবে না।
এই দুই তরুণকে দেখলে খুব সহজেই ইমরান খানের অবয়ব ও ব্যক্তিত্বের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। কাসিম পেয়েছেন বাবার সেই বিখ্যাত লম্বা চুল। অন্যদিকে সুলাইমানের ঝোঁকটা বাবার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার দিকে।
মতামত (0)