আন্তর্জাতিক

ইরানের নির্বাসিত রাজপুত্রের রাজনৈতিক স্বপ্ন অনিশ্চয়তায়

ইরানের নির্বাসিত রাজপুত্রের রাজনৈতিক স্বপ্ন অনিশ্চয়তায়
ইরানের নির্বাসিত রাজপুত্রের রাজনৈতিক স্বপ্ন অনিশ্চয়তায়
ইরানের নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভির ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ এলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতি তার নীরবতা প্রবাসী ইরানিদের হতাশ করেছে, যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

ইরানের নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি বিগত অর্ধশতক ধরে নিজের দেশে পা রাখেননি। ১৯৭৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক শাহের ছেলে হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইরানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বলে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন তহবিল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাসীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

এই বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর রেজা পাহলভির সামনে একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ আসে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আগ্রাসন শুরুর পরপরই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ‘ইরানের বর্তমান সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দেশের জনগণ আমাকে আহ্বান জানিয়েছে। আমি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

চলতি বছরের মার্চে টেক্সাসে অনুষ্ঠিত ‘কনভারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্স’–এ পাহলভি বিপুল অভ্যর্থনা পান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক এবং বহু ইরানি-আমেরিকান তাকে ৪৫ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান। তাদের অনেকের গায়ে বিপ্লব-পূর্ববর্তী ইরানের পুরোনো পতাকা ছিল, যা পাহলভির বাবার শাসনামলে ব্যবহৃত হতো।

ওই অনুষ্ঠানের ঠিক চার দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানকে গুঁড়িয়ে দেব কিংবা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব!’ ট্রাম্পের এই ক্ষতিকর মন্তব্য অনেক প্রবাসী ইরানিকে আতঙ্কিত করে তোলে।

পাহলভিকে অর্থায়ন করা বেশ কয়েকজন ইরানি-আমেরিকান সমর্থক ট্রাম্পের এ মন্তব্যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তাদের একজন জানান, ইরানে পাহলভি নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন—এমন আশা নিয়ে তারা সম্প্রতি পাহলভির নির্বাচনী তহবিলে ৩০ লাখ ডলারের (প্রায় ৩৬ কোটি টাকা) বেশি অর্থ দিয়েছেন।

কিন্তু প্রবাসী এই রাজপুত্র ট্রাম্পের এমন ভয়াবহ মন্তব্যের কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেননি। তার এমন নীরবতা তাকে অর্থ দেওয়া ব্যক্তিদের বেশ হতাশ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পাহলভি ট্রাম্পের ধ্বংসাত্মক বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে তিনি নিজের দেশের মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেয়ে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বেশি পক্ষপাতী—জনমনে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে।

পাহলভির এই নীরবতা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এ ঘটনা প্রবাসী ইরানিদের মধ্যকার গভীর ফাটল যেমন স্পষ্ট করে তুলেছে, তেমনি তার রাজনৈতিক স্বপ্নকেও বড় অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। ধনী প্রবাসী ইরানিরা পাহলভিকে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মূল অভিভাবক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।

সমালোচকদের ধারণা, পাহলভি তার প্রভাবশালী মার্কিন বন্ধুদের হারাতে চান না। বিশেষ করে ডানপন্থী রিপাবলিকানদের সমর্থন হারানোর ভয়েই তিনি নীরব ছিলেন। বছরের পর বছর ধরে পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রের এই ডানপন্থী নেতাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। তিনি নিজেকে ক্ষমতা ফিরে পেতে চাওয়া কোনো রাজপরিবারের রাজা হিসেবে তুলে ধরেননি। তিনি নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে দাবি করে আসছেন।

পাহলভির গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা তার বাবার একনায়কতান্ত্রিক অতীত। ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি তার কুখ্যাত গুপ্ত পুলিশ ‘সাভাক’ দিয়ে কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করেছিলেন, যিনি পরে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হন।

ট্রাম্পের ওই হুমকি অনেক মধ্যপন্থী ও বাম ঘরানার প্রবাসী ইরানির কাছে ছিল তাদের দেশের অস্তিত্বের ওপর বড় আঘাত। তাদের চোখে, পাহলভির এই নীরবতা আসলে ইরানের ওপর ধ্বংসাত্মক বিদেশি হামলাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করার শামিল। তাদের সেই মহৎ উদ্যোগ ও বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন হঠাৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...