বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গত ২৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে এক বৈঠকে ৯ দফা দাবি পেশ করেছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই দাবিগুলো তুলে ধরে, যা দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা। এছাড়াও, জামায়াত তাদের দাবির মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের পদধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনরত রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও নির্বাচনে অযোগ্য করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মিয়া গোলাম পরওয়ার তাদের দাবিসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এবং একইসঙ্গে ইসির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই বৈঠকে মূলত চারটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অতিরিক্ত সচিব সামসুল আলম একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং অতীতে বিএনপির নির্বাচনী আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন। এমন একজন ব্যক্তিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসিতে নিয়োগ দেওয়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়। জামায়াত মনে করে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। জামায়াতের পক্ষ থেকে ইসিকে সামসুল আলমের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, কমিশন জানায় তারা এ বিষয়ে অবগত ছিল না এবং সরকার চুক্তিভিত্তিক এই নিয়োগ দিয়েছে। জামায়াত এই উত্তরে ইসির অসহায়ত্ব ও অক্ষমতার চিত্র ফুটে উঠেছে বলে মন্তব্য করে, কারণ ইসি চাইলে এই নিয়োগে আপত্তি জানাতে পারতো এবং একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রমাণ করতে পারতো।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার যে প্রস্তাব ইসি সম্প্রতি চূড়ান্ত করেছে, সেটির তীব্র বিরোধিতা করেছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার যুক্তি দেন যে, স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং জাতীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তিনি এই প্রস্তাবকে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেন। জামায়াতের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ইসি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে দেখবে বলে আশ্বাস দিয়েছে, যা শিক্ষক সমাজের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। এছাড়াও, জামায়াত পুনরায় দাবি জানিয়েছে যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের পদধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হোক। তাদের মতে, ব্যক্তির নির্বাচন করাও এক ধরনের রাজনীতি, তাই নিষিদ্ধ দলের কোনো পদাধিকারীর অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ হওয়া উচিত, যাতে নির্বাচনের মাঠে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা না থাকে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানান। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের পদে থেকে মাত্র কয়েক মাস কাজ করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া মানেই হচ্ছে নির্বাচনকে নিরপেক্ষ হতে না দেওয়া। তার মতে, এ ধরনের নিয়োগ দলীয়করণ এবং পক্ষপাতিত্বমূলক নির্বাচনের পথ তৈরি করে, যা স্বচ্ছতার পরিপন্থী এবং ভোটারদের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেন, যা ইসির এখতিয়ারের ওপর হস্তক্ষেপ বলে তারা মনে করে। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সরোয়ার আলমগীরের গেজেট এবং শপথের দ্রুততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, সর্বোচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার দিনই ইসি স্বাক্ষর করা আদেশ আসার অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে গেজেট জারি ও শপথের ব্যবস্থা করেছে, যা কমিশনের রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকার প্রমাণ দেয়। তিনি ইসি কর্মকর্তাদের 'বডি ল্যাঙ্গুয়েজ' দেখেও তাদের ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন, যা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।
জামায়াতের এই নেতা ইসির স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি বিরাট ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান হলেও তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য যে দায়িত্ব পালন করতে পারছে, না সে কথা তারা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছে। এই স্বীকারোক্তি ইসির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি ইঙ্গিত দেয়। বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধিদলে মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দীন সরকার এবং অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষে বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ এবং সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন, যা বৈঠকের গুরুত্বকে নির্দেশ করে।



মতামত (0)