জাতীয়

ইসলামে ভালো কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহের দৃষ্টান্ত

ইসলামে ভালো কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহের দৃষ্টান্ত
ইসলামে ভালো কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহের দৃষ্টান্ত
ইসলাম মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করতে এবং প্রতিভাকে পরিচর্যা করতে উৎসাহ দিয়েছে। রাসুল (সা.) ও খলিফাদের জীবনে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে।

ভালো কাজের আন্তরিক প্রশংসা করা বা উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য বলা মানব মনস্তত্ত্বে এক অফুরন্ত শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের ইতিবাচক শব্দ মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। অন্যদিকে, নিরুৎসাহিত করা বা নেতিবাচক মন্তব্য মানুষের ভেতরের সম্ভাবনাকে শুরুতেই নষ্ট করে দিতে পারে।

ইসলাম মানবীয় অনুভূতির এক অনন্য পাঠশালা হিসেবে পরিচিত। ইসলামি সংস্কৃতিতে মানুষকে ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করা, ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রতিভাকে পরিচর্যা করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে ভালো কাজের জনসমক্ষে প্রশংসা ও মূল্যায়ন করার চমৎকার নজির স্থাপন করেছেন রাসুল (সা.) নিজেই।

‘জি কারাদ’ যুদ্ধের (লাহাব অভিযান) দিনে সাহাবি আবু কাতাদাহ (রা.) এবং সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.) মুশরিকদের বিরুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে তাঁদের বীরত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে ঘোষণা করেন, ‘আজকের দিনে আমাদের সর্বোত্তম অশ্বারোহী হলেন আবু কাতাদাহ এবং সর্বোত্তম পদাতিক মুজাহিদ হলেন সালামা ইবনুল আকওয়া’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮০৭)। নবীজি (সা.) কেবল মৌখিক প্রশংসাই করেননি, বরং সালামাকে বিশেষ উপহার হিসেবে অশ্বারোহী ও পদাতিক উভয় বাহিনীর সমপরিমাণ গনিমতের অংশ প্রদান করেন।

মদিনায় প্রত্যাবর্তনের সময় নবীজি পরম ভালোবাসায় সালামাকে নিজের উটের পেছনে বসিয়ে নেন। এই ঘটনার ব্যাখ্যায় নববি (রহ.) লিখেছেন, ‘এই হাদিস প্রমাণ করে যে বীর ও গুণী মানুষের জনসমক্ষে প্রশংসা করা একটি প্রশংসনীয় সুন্নত। বিশেষ করে কোনো মহৎ কাজের পর কাউকে বাহবা ও সম্মান দেওয়া উচিত, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং উপস্থিত বাকি সবাই সৎকাজে আরও বেশি উৎসাহিত হয়’ (ইমাম নববি, ১২/১৮২, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)। ব্যক্তিগত পর্যায়েও রাসুল (সা.) সাহাবিদের দ্বিধাহীন কাজের প্রশংসা করে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিতেন।

সাহাবি আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) বিদায় হজে নবীজির দরবারে উপস্থিত হলে নবীজি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কি হজের নিয়তে করেছ?’ তিনি ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলে নবীজি আবার জানতে চান, ‘কী নিয়তে ইহরাম বেঁধেছ?’ আবু মুসা (রা.) বলেন, ‘আমি বলেছি, হে আল্লাহ, আপনার রাসুল যেভাবে নিয়তে করেছেন, আমিও ঠিক সেভাবেই নিয়তে করছি।’ তাঁর এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক অনুকরণ দেখে নবীজি পরম স্নেহে তাঁর পিঠ চাপড়ে বলেন, ‘বাহ, তুমি অত্যন্ত চমৎকার কাজ করেছ!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৫৯)। একটি ছোট্ট প্রশংসা সাহাবির অন্তরে সুন্নাহ অনুসরণের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

যোগ্যতার মূল্যায়ন ও কনিষ্ঠদের মতামত প্রকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের প্রজ্ঞা ছিল অতুলনীয়। একবার খলিফা ওমর (রা.) প্রবীণ সাহাবিদের মজলিসে সুরা আল-বাকারার একটি গভীর মর্মার্থসম্পন্ন আয়াতের (আয়াত: ২৬৬) তাফসির জানতে চাইলেন। উপস্থিত অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে বললেন, ‘আল্লাহই ভালো জানেন।’

ওমর (রা.) কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘তোমরা বলো আমরা জানি অথবা আমরা জানি না।’ মজলিসে উপস্থিত তরুণ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তখন অত্যন্ত লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, এ বিষয়ে আমার অন্তরে সামান্য কিছু কথা রয়েছে।’ প্রবীণদের ভিড়ে কিশোর ইবনে আব্বাস যেন সংকোচবোধ না করেন, সে জন্য ওমর পরম মমতায় তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘বলো ভাতিজা, নিজেকে কখনো ছোট বা তুচ্ছ মনে কোরো না।’ এরপর ইবনে আব্বাস আয়াতটির এমন অনুপম ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেন, যা শুনে ওমর (রা.) মুগ্ধ হয়ে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫৩৮)।

প্রবীণদের সামনে একজন কিশোরের প্রতি ওমরের এই উৎসাহব্যঞ্জক আচরণই পরবর্তী সময় ইবনে আব্বাসকে ‘মুফাসসিরুল কোরআন’ বা কোরআনের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারীতে পরিণত করেছিল। শিক্ষক ও অভিভাবকের অনুপ্রেরণা কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার অনন্য দৃষ্টান্ত হলেন ফিকহে হানাফির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)। শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে আবু ইউসুফ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হচ্ছিলেন।

সংসারের অভাব মেটাতে তাঁর মা চাইলেন ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে কাপড় সেলাই বা ধোলাইয়ের কোনো পেশায় যুক্ত হোক। কিন্তু জ্ঞানপিপাসু কিশোর আবু ইউসুফের মন পড়ে থাকত ইলমের পাঠশালায়। তিনি কাজ ফেলে বারবার ইমাম আবু হানিফার দরসে গিয়ে বসে থাকতেন। একদিন তাঁর মা সরাসরি ইমামের মজলিসে এসে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আমার এই এতিম ছেলেটার মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। আপনি ওকে কেন আটকে রেখেছেন? ওকে কাজ করে খেতে দিন।’

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তখন কিশোর আবু ইউসুফের সুপ্ত মেধা ও নিষ্ঠা লক্ষ করে তাঁর মাকে আশ্বস্ত করে এক ঐতিহাসিক বাক্য উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, ‘হে নারী, শান্ত হও। তোমার ছেলে এখন মহান জ্ঞান অর্জন করছে। আল্লাহর ইচ্ছায় এমন একদিন আসবে, যখন সে রাজকীয় ফিরোজা পাথরের পাত্রে পেস্তাবাদামের তেলে প্রস্তুত সুস্বাদু ফালুদা গ্রহণ করবে!’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ১০/৬০৭, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৮)। দরিদ্র মায়ের কাছে কথাটি তখন অবাস্তব মনে হলেও শিক্ষকের এই ভবিষ্যদ্বাণী ও অনুপ্রেরণাদায়ী আশ্বাস কিশোর আবু ইউসুফের অন্তরে জ্ঞানসাধনার শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...