ধর্মইসলামে ক্ষুধা নিবারণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের নির্দেশনা
ইসলামে ক্ষুধা নিবারণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের নির্দেশনা
ইসলাম ধর্মে সম্পদের মালিক আল্লাহ, মানুষ তার আমানতদার। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা প্রতিরোধে ইসলাম সামাজিক সংহতিকে গুরুত্ব দেয় এবং অভাবীদের কল্যাণে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে।
ইসলাম ধর্মে জীবিকার মূল মালিক হলেন আল্লাহ। মানুষ শুধু সেই সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক বা আমানতদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা প্রতিরোধে ইসলাম সামাজিক সংহতিকে অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। জাকাতকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি করা হয়েছে।
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) জাকাতের সুরক্ষায় রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সমাজের অভাবগ্রস্তদের ক্ষুধা নিবারণ এবং পারস্পরিক সংহতি রক্ষায় কোরআন ও সহিহ হাদিসের বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে। এসব নির্দেশনায় সম্পদের মালিকানা ও ব্যয়ের বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি দর্শনে ধনসম্পদের ওপর মানুষের নিরঙ্কুশ বা স্বেচ্ছাচারী মালিকানা নেই। মানুষ আল্লাহর অর্পিত সম্পদের জিম্মাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, "তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো এবং আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদের আমানতদার বা প্রতিনিধি বানিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করো। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে ও ব্যয় করেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।" (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৭)। এই উপলব্ধি মানুষের ভেতর থেকে কৃপণতা দূর করে এবং অন্যের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া সহজ করে।
ইসলামে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা এবং তা আর্তমানবতার কল্যাণে ব্যয় না করাকে চরম অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, "এবং যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।" (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৪)। সম্পদের প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে গুটি কয়েক মানুষের হাতে বন্দি থাকলে সমাজে তীব্র ক্ষুধা ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়।
অনেক স্বার্থপর মানুষ যুক্তি দেয় যে, আল্লাহ যাকে দরিদ্র বানিয়েছেন, তাকে আমরা কেন খাওয়াব। কোরআন এই ধরনের মানসিকতাকে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে বলা হয়েছে, "যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ তোমাদের যে জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করো, তখন কাফেররা মুমিনদের বলে—আমরা কি এমন কাউকে খাওয়াব, যাকে আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিজেই খাওয়াতে পারতেন? তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ।" (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৪৭)। অভাবীর ক্ষুধা নিবারণ করা বিত্তবানের জন্য আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম মাপকাঠি।
কোনো অঞ্চলে একজন মানুষও যদি অনাহারে থাকে, তবে তার আশপাশের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ইমানি দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মুহাম্মদ (সা.) সামাজিক ভ্রাতৃত্বের এক চূড়ান্ত মানবিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।" (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১২)।
সামাজিক অনুষ্ঠানে বৈষম্য দূর করতে ইসলাম কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, "সেই ভোজসভার খাবার সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যেখানে শুধু ধনীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং সমাজের দরিদ্র ও অভুক্তদের বাদ দেওয়া হয়..."। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৭৭)। ভোজনোৎসবে সমাজের গরিব-মিসকিনদের সম্মানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করাই হলো ইসলামি সংস্কৃতির আসল সৌন্দর্য।
সমাজের মানুষের প্রয়োজনে ব্যয় করলে সম্পদ কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, "প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি (মানুষের কল্যাণে) ব্যয় করে, আপনি তাকে এর উত্তম প্রতিদান দিন।’ আর অপর ফেরেশতা দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি সম্পদ আটকে রাখে বা কৃপণতা করে, আপনি তাকে ধ্বংস করে দিন’।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৪২)।
দানশীলতার ক্ষেত্রে পরিমাণের চেয়ে আন্তরিক সদিচ্ছাই মুখ্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, "তোমরা দোজখের আগুন থেকে নিজেদের বাঁচাও, তা একটি খেজুরের অর্ধেক দান করার বিনিময়ে হলেও।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪১৭)। অতি সামান্য খাদ্য দিয়েও যদি কারো ক্ষুধা নিবারণ করা যায়, তবে তা মানুষের পরকালীন মুক্তির অন্যতম বড় উসিলা হতে পারে।
আর্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সময় কোনো প্রকার যশ, খ্যাতি বা প্রতিদানের আশা করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোরআনে খাঁটি মুমিনদের গুণাবলি তুলে ধরে বলা হয়েছে, "তারা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মিসকিন, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে। এবং তারা বলে—আমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের আহার করাচ্ছি; আমরা তোমাদের কাছ থ..."।
মতামত (0)