জাতীয়জাতিসংঘে নতুন বিশ্ব মানচিত্র গ্রহণ, আফ্রিকার প্রকৃত আকার প্রদর্শিত হবে
জাতিসংঘে নতুন বিশ্ব মানচিত্র গ্রহণ, আফ্রিকার প্রকৃত আকার প্রদর্শিত হবে
জাতিসংঘ পুরোনো মারকেটর বিশ্ব মানচিত্র বাদ দিয়ে নতুন একটি মানচিত্র গ্রহণ করেছে, যা আফ্রিকার প্রকৃত আকার সঠিকভাবে দেখাবে।
জাতিসংঘ দুই দিন আগে শুক্রবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ষোড়শ শতকের পুরোনো মারকেটর বিশ্ব মানচিত্র বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখন থেকে নতুন একটি মানচিত্র ব্যবহার করা হবে, যেখানে প্রতিটি দেশের আসল আকার সঠিকভাবে দেখানো হবে।
আফ্রিকা মহাদেশকে এত দিন মানচিত্রে অনেক ছোট দেখানো হতো। আফ্রিকান দেশগুলো এই ভুল ঠিক করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল। আফ্রিকান ইউনিয়নের এই প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট প্রজাতন্ত্র টোগো।
বহুল ব্যবহৃত পুরোনো মারকেটর মানচিত্রে মেরু অঞ্চলের দিকের দেশগুলোকে তাদের আসল আকারের চেয়ে অনেক বড় দেখাতো। এর ফলে অন্যান্য দেশের আকার বদলে যেত। উদাহরণস্বরূপ, এই মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমান বড় দেখায়, যদিও বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশটি গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
আফ্রিকান দেশগুলো শত শত বছরের পুরোনো এই ভুল ঠিক করার আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নতুন বিশ্ব মানচিত্র গ্রহণের পক্ষে রায় দিয়েছে। মোট ১৬৪টি দেশ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে, ৬টি দেশ ভোট দেয়নি এবং কেবল যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের সঠিক আকার দেখানো। গবেষকদের মতে, আগের মানচিত্রে বিকৃতির কারণে মানুষের মনে আফ্রিকা মহাদেশকে ছোট ও কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবার একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। আমরা যেসব মানচিত্র দেখে অভ্যস্ত, সেগুলোর বেশিরভাগ ১৫৬৯ সালে ইউরোপীয় মানচিত্রকার জেরার্ডাস মারকেটরের তৈরি প্রজেকশন।
মারকেটর প্রজেকশন দিক চেনার জন্য সুবিধাজনক হলেও দেশগুলোর প্রকৃত আয়তন ফুটিয়ে তুলতে পারতো না। এই পদ্ধতিতে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের পরিমাপ বিকৃত হয়ে যায়। ফলে বিষুবরেখা থেকে দূরের দেশগুলোকে কাছের দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বড় দেখায়।
মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে বিশাল দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের চেয়েও বড় এবং আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সমান দেখাতো। অথচ বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড হলো মধ্য আফ্রিকার ছোট্ট দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সমান। অনেক গবেষক মনে করেন, এই মানচিত্র এতকাল ধরে টিকে থাকার পেছনে একটি অদৃশ্য কারণ রয়েছে।
এটি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো পশ্চিমা বিশ্বকে অনেক বড় ও একদম কেন্দ্রে ফুটিয়ে তোলে। যা একধরনের মানসিক আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। জাতিসংঘ তাদের নতুন প্রস্তাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, মানচিত্রের এই ভুল আকারের কারণে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াকে বাস্তবে অনেক ছোট মনে করা হয়।
এর ফলে বিশ্বজুড়ে অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। এই বিকৃতি শুধু ভূগোলেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আফ্রিকার অবকাঠামোগত প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রকৃত সমৃদ্ধিকে ছোট করে দেখার মানসিকতা তৈরি করে।
নতুন এই প্রস্তাবে ঐতিহাসিক অন্যায্যতার বিচার ও স্মারক ক্ষতিপূরণের প্রতীক হিসেবে মারকেটর প্রজেকশনের বদলে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন বিভিন্ন দেশের প্রকৃত আয়তন ও ক্ষেত্রফলকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। ২০১৮ সালের উত্তর আমেরিকান কার্টোগ্রাফিক ইনফরমেশন সোসাইটি সম্মেলনে এটি প্রথম তুলে ধরা হয়।
এই নতুন মানচিত্রে ইউরোপকে কিছুটা ছোট, ব্রাজিলকে প্রসারিত ও গ্রিনল্যান্ডকে অনেকটাই ছোট দেখায়। এর বিপরীতে আফ্রিকাকে দেখা যায় অনেক বড় ও সুস্পষ্টভাবে। এই বছরের মার্চ মাসে আফ্রিকান ইউনিয়ন ‘ইকুয়াল আর্থ ম্যাপ’ গ্রহণ করে।
এরপর এপ্রিল মাসে টোগো আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের অন্য সদস্যদেরও একই পথ অনুসরণের আহ্বান জানায়। তারই ধারাবাহিকতায় এই খসড়া প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়। জুলাই মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এই ভোটাভুটি হয়।
আফ্রিকার স্বাস্থ্য, মানবিক বিষয় ও সামাজিক উন্নয়ন বিভাগের কমিশনার আম্মা টুম-আমোআহ মার্চ মাসে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, "যে আফ্রিকাকে এত দিন মানচিত্রে ছোট করে দেখানো হতো, তা এখন ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সব দিক থেকেই নিজের প্রকৃত গুরুত্ব ও আকার বিশ্বজুড়ে তুলে ধরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।" নিউজিল্যান্ডও দীর্ঘদিন ধরে মারকেটর মানচিত্র নিয়ে আপত্তি তুলে আসছিল।
মতামত (0)