জাতীয়

সম্পর্কে ছাড় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা

সম্পর্কে ছাড় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা
সম্পর্কে ছাড় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা
সম্পর্কে ভালো চরিত্রের ধারণা এবং মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক নির্যাতনকে খারাপ চরিত্রের অংশ হিসেবে না দেখার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

অনেক ব্যক্তি মনে করেন, ভালো চরিত্রের অর্থ শুধু পরকীয়ায় না জড়ানো বা ফ্লার্ট না করা। তবে মুখ খারাপ করা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, আর্থিক নিপীড়ন—এসবকেও অনেক সময় খারাপ চরিত্রের অংশ হিসেবে দেখা হয় না। সমানে মানসিক চাপ (গ্যাসলাইটিং) তৈরি করলেও অনেকে ভালোবাসা আছে বলে ধরে নেন।

সমাজে অনেকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে থাকেন এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এর ফলে তারা এমন কিছু মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বা বিয়ে করেন, যারা শুরুতে ভালো মানুষের অভিনয় করে। এসব সম্পর্ক একসময় নরকে পরিণত হয়।

এই ব্যক্তিরা প্রায়শই এমন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না, কারণ তাদের পারিবারিক পরিবেশও অনেক সময় বিষাক্ত হয়ে থাকে। তারা এই নতুন সঙ্গীদের উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখে, কারণ তারাই হয়তো প্রথম জীবনে কিছু মিষ্টি কথা বলে তাদের মুগ্ধ করে বা গুরুত্বপূর্ণ অনুভব করায়।

তবে এই মুগ্ধতা বা গুরুত্ব অনুভবের পেছনে কতটা অভিনয় থাকে, তা তারা একবারও ভাবেন না। তারা বিশ্বাস করতে পারেন না যে, এই ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে কতটা জঘন্য মানসিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে।

যারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী, তাদের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন ওঠে কেন তারা এমন নিপীড়ক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যান। এই ধরনের আচরণ শুধু পুরুষরাই করে না, নারীরাও তাদের সঙ্গী ও সন্তানদের জীবন বিষিয়ে তোলে।

অনেক সময় কর্মজীবী ব্যক্তিরাও নিজেদের ভালো রাখার চেষ্টা না করে, তাদের সুখের সব দায়িত্ব স্বামী বা সঙ্গীর ওপর চাপিয়ে দেন। এর ফলে তারা নিজেরাও বিষাক্ত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

এই ধরনের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস তারা পান না, কারণ তারা মনে করেন বাবা-মা মেনে নেবেন না বা তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করার কারণে তাদের জীবনের মূল্য কমে গেছে, এমন ভাবনাও অনেকে পোষণ করেন।

যারা নিজেদের সংসারী ভাবেন এবং সিন্ডারেলা সিনড্রোমে ভোগেন, তাদেরও বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত। সংসার ও সন্তানের জন্য সব কিছু ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকাটা অনেকের কাছে সঠিক মনে হতে পারে।

তবে, নিজের জীবনকে বিষিয়ে তুলে এবং কোনো বিকল্প না রেখে সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এবং পরে স্বপ্নভঙ্গ হলে তাদের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। অর্থ বা অন্য কোনো সমর্থনের উৎস না থাকার কারণে তারা এমন এক সঙ্গীর সঙ্গে আটকে পড়েন, যার কারণে জীবন নরকের মতো মনে হয়।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই স্বেচ্ছায় নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দেন। তারা নিজেদের স্বাধীনতার চাবিকাঠি বদ চরিত্রের মানুষ এবং তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেন, কোনো প্রকার প্রস্থানের পথ না রেখেই।

অনেকে কেবল সন্তানদের ভাঙা পরিবারের সন্তান হওয়া থেকে বাঁচাতে এই বিষাক্ত পরিবেশে থেকে যান। তবে নিজের জীবন যদি নরক হয়, তবে সন্তানদের আসলে কী দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন ওঠে।

এই ধরনের পরিবেশে শিশুরা একই বিষাক্ত চক্র শিখছে। তারাও অন্যের বিষাক্ত আচরণকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেবে এবং মেনে নেবে, কারণ তাদের কাছেও এই সংসার নরকতুল্য ছিল, যদিও অভিভাবকদের কাছে তা স্বর্গ মনে হতে পারে।

এই বিষাক্ততার মাঝে কেউ যদি সামান্য মায়া বা মমতা দেখায়, তবে শিশুরা তাদের সব দিয়ে আঁকড়ে ধরে এবং সারা জীবনের জন্য প্রতারিত হয়ে একই ফাঁদে পড়ে।

উচ্চশিক্ষিত হয়েও কাজ ছেড়ে সংসারী হওয়ার মতো অবাস্তব ভাবনা এই যুগে কেন বজায় রাখা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেক সময় সঙ্গী সন্তান বা নিজের ভরণপোষণ না দিয়ে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, সামাজিক, আর্থিক এবং কটুকথার মাধ্যমে অত্যাচার করে।

এমন পরিস্থিতিতেও অনেকে অন্যদের কাছে জানতে চান, তাদের কী করা উচিত। এর কারণ হলো, ততদিনে তাদের আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। তারা ভুলে যান যে, তারাও শক্তিশালী মানুষ এবং নিজেদের ও সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার যোগ্যতা তাদের আছে।

অনেকে কষ্টকর একা যাত্রাপথে যেতে রাজি নন বা ভয় পান। কারণ, তারা আজীবনই কারও না কারও ওপর নির্ভরশীল হওয়াটাই শিখেছেন।

এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি যে, বাবা-মা বা স্বামী/প্রেমিক সব করে দেবে। নিজের জীবনের দায় এবং ভালো থাকার দায় নিজের। সন্তানদের একটি সুস্থ জীবন দেওয়ার দায়িত্বও ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের।

যদি কেউ সঙ্গী দেবতুল্য মনে করে সব ছেড়ে ঘরকন্না করেন, তবে এটি তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে, যেদিন সেই দেবতা দানবে পরিণত হবে, সেদিন কীভাবে নিজের সম্মান বজায় রেখে নিজেকে চালানো যাবে, তার একটি প্রস্থানের পরিকল্পনা (এক্সিট পয়েন্ট) মনে গেঁথে নেওয়া উচিত।

বিয়ে জীবনের শেষ গন্তব্য নয়। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সমর্থন না পাওয়ার বা তাদের মেনে না নেওয়ার ভয় ভুলে যাওয়া উচিত। জীবন নিজের, বাবা-মা একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত গড়ে দিয়েছেন, বাকিটা নিজের দায়িত্ব।

একজন কর্মক্ষম ও কর্মশীল ছেলে কখনো ভাবে না যে, স্ত্রী ছেড়ে দিলে তারা বাবা-মায়ের ঘরে গিয়ে উঠবে। এই বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত, কারণ সেই ক্ষমতা একজন নারীরও আছে, কিন্তু তারা তা ব্যবহার করে না।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...