জাতীয়

জাতিসংঘের কার্যকরিতা ও আস্থা ফেরাতে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের

জাতিসংঘের কার্যকরিতা ও আস্থা ফেরাতে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের
জাতিসংঘের কার্যকরিতা ও আস্থা ফেরাতে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও বৈশ্বিক আস্থা পুনরুদ্ধারে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি সংস্কার এবং বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। চলতি অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তিনি জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোকপাত করেন।

ড. খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত বৈষম্য গভীরভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সদস্যগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও আফ্রিকা নিরাপত্তা পরিষদে কোনো স্থায়ী আসন পায়নি। একইসাথে আফ্রিকা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, আফ্রিকাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে যথাযথভাবে স্থান দিতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের দাবি কোনো করুণা নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার এবং জাতিসংঘের নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতার একটি মৌলিক প্রশ্ন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তা পরিষদকে আরও স্বচ্ছ ও প্রতিনিধিত্বশীল করা অপরিহার্য।

এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে সফল করতে তিনি সাধারণ পরিষদের আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়ার প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা পুনরুদ্ধারে ড. খলিলুর রহমান তিনটি প্রধান কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজেদের ব্যর্থতা সম্পর্কে স্পষ্টবাদী ও বাস্তববাদী হওয়া, সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সাধন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজ ও বিজ্ঞানীদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা।

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং সামরিক খাতের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে থমকে আছে। এই সময়ে ওইসিডি দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা এক বছরে ২৩ শতাংশ কমে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এর বিপরীতে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই অসমতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ড. খলিলুর রহমান গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের পরিস্থিতি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নীতি কখনোই নির্বাচনী বা পক্ষপাতমূলকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। সকল পরিস্থিতিতে এই নীতিগুলো সমানভাবে কার্যকর করা উচিত। পাশাপাশি বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির এবং হাইতিতে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমের ইতিবাচক ভূমিকার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন, যা জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে নির্দেশ করে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও সামরিক খাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এআইয়ের অপব্যবহার মানব সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ড. খলিলুর রহমান এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন। তিনি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক নীতিমালা এবং একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (‘গার্ডরেল’) তৈরির আহ্বান জানান। এই পদক্ষেপগুলো মানবজাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...