আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

আজ সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৫১ ডলার বা ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়ে ৯০ দশমিক ৬১ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১৩ ডলার বা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠেছে। কিছু প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ১৫ ডলার বেড়ে ৯১ দশমিক ২৫ ডলারে এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ৯৬ ডলার বেড়ে ৮৬ দশমিক ৩৬ ডলারে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।

গতকাল রোববার মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী ব্যবস্থায় হামলা চালায়। জুলাইয়ের শেষের পর উপসাগরীয় এই দেশটিতে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরান যাতে হরমুজ প্রণালীতে আরও সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করতে না পারে, মূলত সেই প্রতিরোধমূলক লক্ষ্যেই তারা এই হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানায়, হরমুজ প্রণালীতে ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ তৈরি করা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মাইন স্থাপনকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী সীমিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযান চালিয়েছে। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ থেকে সমুদ্রের মাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। মার্কিন বাহিনী ওই এলাকা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

এর জবাবে আজ সোমবার জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরান হামলা চালিয়েছে। ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এই তথ্য জানিয়েছে। কিং হুসেইন ও আজরাক বিমানঘাঁটিতে চালানো ওই হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরান।

তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে বলে জানিয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র কোথা থেকে ছোড়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তারা কিছু জানায়নি। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় তাদের কয়েকজন হতাহত হয়েছে। জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলাটি ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকাশপথে চালানো আগ্রাসনের জবাব’ হিসেবে করা হয়েছে।

তেহরান পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক কর্মীদেরও লক্ষ্যবস্তু করার কথা জানায়। পুরো যুদ্ধজুড়েই ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও দেশটির মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তেহরান। এসব হামলার মধ্যে কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও কয়েকটি দেশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘটনাও রয়েছে।

এই পাল্টাপাল্টি হামলা এমন এক সময়ে ঘটলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পূর্ণ হতে চলেছে। ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এমন এক সময়ে এই সংঘাতের নতুন পর্ব শুরু হলো, যখন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত কিছুটা কমে এসেছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়। গত এপ্রিল মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়। এরপর জুন মাসে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়, কিন্তু এখন পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এর আগে জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের ভূখণ্ডে সর্বশেষ মার্কিন হামলা হয়েছিল ২৯ জুলাই। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ওই হামলা চালানো হয়েছিল ‘এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের আকস্মিক হামলার চেষ্টা’ প্রতিহত করতে। জুলাইয়ের শুরুতে টানা ১৩ রাত ইরানে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড।

গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার পরিবর্তে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ বা অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ঘোষণা করে। ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ দেশটির জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করছে। একই সময়ে ইরানে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদনেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল, জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে এবং কোথাও কোথাও সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ থমকে যাওয়ার আশঙ্কার প্রতিফলন। যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে এবং একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি চুক্তি হচ্ছে, ততক্ষণ তেলের বাজার রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে অস্থিরই থাকবে। নতুন করে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ফের ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।

হরমুজ প্রণালীর লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এই ভিডিওগুলোতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপে বোমাবর্ষণের দৃশ্য দাবি করা হয়েছে। একটি ফুটেজে খার্গ দ্বীপে তেল সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক ও একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বড় ধরনের বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায়। ট্রাম্প তার একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে এসব ভিডিও শেয়ার করেন।

তবে খার্গে এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়নি। ট্রাম্পের শেয়ার করা ফুটেজগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে জানা গেছে। পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পরও খার্গ দ্বীপে হামলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি এবং ইরানের গণমাধ্যমেও এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ইরানের জন্য খার্গ দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হতো। ফলে সেখানে হামলা হলে ইরানের তেল রপ্তানি এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...