আন্তর্জাতিক

নাসার নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ ন্যান্সি গ্রেস রোমানের মহাকাশ যাত্রা

নাসার নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ ন্যান্সি গ্রেস রোমানের মহাকাশ যাত্রা
নাসার নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ ন্যান্সি গ্রেস রোমানের মহাকাশ যাত্রা
মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে নাসার নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে যাত্রা শুরু করেছে। এটি ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, কৃষ্ণগহ্বর ও বহির্গ্রহ নিয়ে গবেষণা করবে।

মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনের লক্ষ্য নিয়ে নাসার নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান’ স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে যাত্রা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে গতকাল রবিবার সকালে টেলিস্কোপটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।

ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, কৃষ্ণগহ্বর এবং সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা বহির্গ্রহ নিয়ে গবেষণাই রোমান টেলিস্কোপের প্রধান লক্ষ্য। বিজ্ঞানীদের আশা, এই টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের বর্তমান ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। নাসার প্রশাসক নিকি ফক্স বলেন, রোমান মহাবিশ্বকে দেখার মানুষের পদ্ধতিই বদলে দিতে পারে। নাসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও এই মিশনের লক্ষ্য—মহাবিশ্বে মানুষ কি একা।

নাসা জানিয়েছে, রোমান মহাকাশের বিশাল এলাকা পর্যবেক্ষণ ও ছবি ধারণ করতে পারবে। এর দেখার ক্ষেত্র হাবল ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বড়। এটি একটি বাসের আকারের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র।

উৎক্ষেপণের প্রায় ৩০ মিনিট পর টেলিস্কোপটি স্পেসএক্সের রকেট থেকে পৃথক হয়ে নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করে। উৎক্ষেপণের প্রায় ১০ মিনিট পর টেলিস্কোপটি সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছে যায়। নাসার রোমান টেলিস্কোপ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক জ্যাকি টাউনসেন্ড উৎক্ষেপণকে সফল ও অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, টেলিস্কোপটির যাত্রা পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে এবং এটি সঠিক পথেই নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

উৎক্ষেপণের পর প্রায় ১০০ দিনের যাত্রা শেষে পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ মাইল দূরের একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে গিয়ে কাজ শুরু করবে টেলিস্কোপটি। এটি সূর্য-পৃথিবী ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ২ (L2)-এর দিকে এগিয়ে চলেছে, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রায় তিন মাসব্যাপী একটি প্রস্তুতি পর্ব চলবে, যেখানে ইঞ্জিনিয়াররা বিভিন্ন সিস্টেম ও যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের জন্য টেলিস্কোপটিকে প্রস্তুত করবেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেনিফার মিলার্ড বলেন, রোমান এমন একটি দূরবর্তী অবস্থানে থাকবে, যেখানে পৃথিবী ও চাঁদ থেকে আসা অবলোহিত আলোর প্রভাব তুলনামূলক কম থাকবে। টেলিস্কোপটিতে থাকা শক্তিশালী অবলোহিত ক্যামেরা মানুষের চোখে অদৃশ্য আলো শনাক্ত করতে পারবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, রোমান টেলিস্কোপ হাজার হাজার থেকে শুরু করে প্রায় এক লাখ পর্যন্ত নতুন বহির্গ্রহের সন্ধান দিতে পারে। এসব গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেখানে প্রাণের জন্য উপযোগী পরিবেশ রয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

রোমান মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ করা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই দুই রহস্যময় উপাদান মিলে মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ গঠিত। তবে এগুলোর প্রকৃত স্বরূপ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা না গেলেও এর মহাকর্ষীয় প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা যায়। এটি ছায়াপথসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন কাঠামোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জিকে মহাবিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারণের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রোমান কোটি কোটি ছায়াপথের বিশদ মানচিত্র তৈরি করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের বিভিন্ন সময়ে ছায়াপথ কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং সময়ের সঙ্গে তাদের বিন্যাস কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হবে। এটি এমন সব মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত করবে, যেগুলো প্রচলিত পর্যবেক্ষণে খুবই ক্ষীণ বা প্রায় অদৃশ্য।

নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ মাইল দূরে অবস্থান করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছে। তবে জেমস ওয়েবের তুলনায় রোমান একসঙ্গে অনেক বড় এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে, ১৯৯০ সালে উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবীর প্রায় ৩০০ মাইল ওপরে কক্ষপথ থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছে।

টেলিস্কোপটির নাম রাখা হয়েছে ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামে। তিনি ১৯৬০-এর দশকে নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন এবং নাসার প্রথম নারী নির্বাহী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ তৈরির অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

নাসার সায়েন্স মিশন ডিরেক্টরেটের সহযোগী প্রশাসক ড. নিকি ফক্স টেলিস্কোপটির উৎক্ষেপণকে একই সঙ্গে আনন্দ ও আবেগের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রস্তুতির পর মহাকাশে টেলিস্কোপটির যাত্রা বিজ্ঞানীদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি বিদায়ের মুহূর্তটিও ছিল আবেগঘন।

নাসা জানিয়েছে, রোমান টেলিস্কোপের প্রাথমিক মিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে এটি ১০ বছর পর্যন্ত কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফোন করে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...