আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে ট্রাম্পের নতুন আদেশ

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে ট্রাম্পের নতুন আদেশ
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে ট্রাম্পের নতুন আদেশ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ সীমিত করতে দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যা অ-নাগরিকদের সংজ্ঞা ও বার্থ ট্যুরিজমকে প্রভাবিত করবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার সীমিত করার উদ্দেশ্যে দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। আগের একটি প্রচেষ্টা সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক খারিজ হয়ে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর তিনি এই পদক্ষেপ নিলেন। গতকাল এই আদেশ জারি করা হয়।

প্রথম আদেশে বর্তমানে বিদ্যমান সেই অ-নাগরিকদের সংজ্ঞা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাদের সন্তানরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হবে না। দ্বিতীয় আদেশের মাধ্যমে তথাকথিত 'বার্থ ট্যুরিজম' নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বার্থ ট্যুরিজম এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে গর্ভবতী মায়েরা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, যাতে তাদের সন্তানরা মার্কিন নাগরিক হতে পারে।

ওভাল অফিস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘এটি বহু বছর আগেই হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমরা এখন এটি করছি।’ তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ১৫০ বছরের পুরোনো নীতি বাতিলের তার আগের প্রচেষ্টা সুপ্রিম কোর্ট প্রত্যাখ্যান করায় সমালোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর প্রথম বাক্যেই 'জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের' নীতির বিষয়টি বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বা নাগরিক অধিকার পাওয়া সব ব্যক্তিই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং রাষ্ট্রের যেখানেই তারা বাস করুন না কেন’। প্রায় একশ বছর ধরে এই নীতিই চলে আসছে যে দেশটিতে কেউ জন্ম নিলে সে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হবে, তবে কূটনীতিক ও বিদেশী সামরিক বাহিনীর বিষয়ে এটি প্রযোজ্য নয়।

অভিবাসন কট্টরপন্থীরা অনেক সময় বলে থাকেন যে, এই নীতিই অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তাদের মতে, এটিই গর্ভবতী নারীদের অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করে।

ট্রাম্পের প্রথম নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, ‘আমাদের দেশের উদারতার সুযোগ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের প্রতারণার চেষ্টা করা ক্ষতিকর বিদেশি পক্ষগুলোর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছে আমার প্রশাসন।’ আদেশটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এমন দুইজন বাবা-মায়ের সন্তান কেবল যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না। এই নিয়ম কার্যকর হবে যদি বাবা-মায়ের একজন বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য হন, কোনো বিদেশী সরকারের কর্মচারী হন, প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন, অথবা এমন কোনো মার্কিন ভূখণ্ডে বসবাস করেন যেখানে ফেডারেল আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। পুয়ের্তো রিকোসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত কিছু ভুখণ্ডে জন্মগ্রহণকারীদের জন্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ফেডারেল আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সদস্যরা বারবার বার্থ ট্যুরিজমের সমালোচনা করেছেন। তারা রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিপক্ষ দেশগুলোর বিরুদ্ধে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশের অভিযোগও এনেছেন। ওভাল অফিস থেকে নির্বাহী আদেশগুলোর ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে কয়েক লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে।

অরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, জনগণনা-ভিত্তিক সবচেয়ে বিস্তৃত হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২২ হাজার থেকে ২৬ হাজার শিশুর জন্ম হয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সরকারি তথ্য দেখায় যে ২০২৪ সালে বিদেশী ঠিকানাধারী মায়েরা ৯ হাজার ৬০০টি সন্তান প্রসব করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পর অফিসে তার প্রথম দিকের দিনগুলোর একটিতে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী দ্বারা নিশ্চিত জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। একটি আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে যায়। জুন মাসে আদালত রায় দেয় যে ট্রাম্পের ২০২৫ সালের নীতিগুলো বহাল রাখা যাবে না এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বই আইন হিসেবে বহাল থাকবে। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে কে বসবাস, কাজ এবং নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারবে তা সীমিত করার ট্রাম্পের চলমান প্রচেষ্টার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা ছিল।

গতকাল বৃহস্পতিবার ওভাল অফিস থেকে নির্বাহী আদেশগুলোর ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, উচ্চ আদালত ‘খারাপ সিদ্ধান্ত, খুবই অন্যায্য সিদ্ধান্ত’ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এর কারণে আমাদের দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং আমরা ভিন্ন উপায়ে এর অবসান ঘটাচ্ছি।’

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিস স্কুল অফ ল-এর অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল চিন বলেন, আদেশের কিছু অংশ হয়তো টিকে থাকতে পারে। তবে অন্যান্য কিছু দিক ‘গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন’ উত্থাপন করে। চিন আরও বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশ সীমিত করার কিছু ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কিন্তু একবার যখন তা ঘটে যায়, একবার যখন কোনো শিশু যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়, তখন সেই শিশুটি নাগরিক নয় বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই।’

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...