ধর্ম

অন্তরের নিয়ত যেভাবে কাজের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে

অন্তরের নিয়ত যেভাবে কাজের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে
অন্তরের নিয়ত যেভাবে কাজের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে
ইসলামে নিয়ত বা সংকল্পকে মানবজীবনের প্রতিটি কাজের চালিকা শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এটি সাধারণ কাজকেও ইবাদতে রূপান্তর করতে পারে।

মানবজীবনে প্রতিটি কাজের বিশালতার চেয়েও অন্তরের চালিকা শক্তি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে এই অন্তরের চালিকা শক্তিকে ‘নিয়ত’ বা সংকল্প বলা হয়। নিয়ত হলো এক অদৃশ্য রূপান্তরকারী শক্তি, যা সাধারণ অভ্যাস বা জাগতিক কাজকেও অত্যন্ত সওয়াবের ইবাদতে পরিণত করতে পারে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিয়তের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং তা বিশুদ্ধ রাখা মুমিনের অন্যতম আত্মিক কাজ।

মানুষের কাজের মূল্যায়ন কেবল তার বাহ্যিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। বরং এটি নির্ভর করে অন্তরের বিশুদ্ধতার ওপর। নিয়ত যদি সঠিক না থাকে, তাহলে বাহ্যিকভাবে বিরাট সাফল্যও আল্লাহর দরবারে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আল্লাহ-তাআলা তাঁর বান্দার অন্তরের সকল খবর জানেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, "হে রাসুল, আপনি মানুষদের বলে দিন, তোমাদের অন্তরে যা কিছু আছে, তোমরা তা গোপন করো বা প্রকাশ করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত আছেন..." (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৯)। রাসুল (সা.) নিয়তের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আরও বলেছেন, "কাজের প্রতিদান তো নিয়তের ওপরই নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)। এই হাদিসটি কাজের মূল্যায়নে নিয়তের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নির্দেশ করে।

নিয়তের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজকর্ম ইবাদতে রূপান্তরিত হতে পারে। জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করা, পরিবারকে সময় দেওয়া, শারীরিক সুস্থতার জন্য আহার গ্রহণ করা অথবা বিশ্রাম করা ইত্যাদি মানুষের প্রাত্যহিক অভ্যাস। এসবের পেছনে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের বিশুদ্ধ নিয়ত থাকে, তবে তার প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, "বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।" (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২)। একজন মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো তাঁর প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা। পার্থিব প্রয়োজন পূরণের সময়ও যখন অন্তরে সওয়াবের আশা থাকে, তখন তা আর সাধারণ কাজ থাকে না, বরং ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে।

নিয়ত বিশুদ্ধ না থাকার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ‘রিয়া’ বা লোক দেখানোর মানসিকতা। কোনো সৎকাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে লোকচক্ষুর প্রশংসা বা সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার উদ্দেশ্যটা যখন মুখ্য হয়, তখন সে কাজও ক্ষতির মুখে পড়ে। এটি ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

পবিত্র কোরআনে লোক দেখানো আমলকারীদের সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, "অতএব বড়ই দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য যারা তাদের নামাজে উদাসীন। যার লোক দেখানোর জন্য তা করে।" (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)। এই আয়াতগুলো লোক দেখানো কাজের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে অবগত করে।

রাসুল (সা.) এ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, "আমি তোমাদের ওপর যে বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করি ছোট শিরক সম্পর্কে।" সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, "ছোট শিরক কী?" তিনি বললেন, "‘রিয়া’ বা লোক দেখানো আমল।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)। এটি লোক দেখানো আমলকে শিরকের মতো গুরুতর পাপের সঙ্গে তুলনা করে।

আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমলের প্রতিদান দিবসে আল্লাহ-তাআলা রিয়াকারীদের বলবেন, "তোমরা ওই লোকেদের কাছে যাও, যাদের দেখিয়ে দুনিয়াতে আমল করতে। আর চেষ্টা করো তাদের কাছ থেকে কোনো বিনিময় বা কল্যাণ পাও কি না?" (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৬৮৩১)। এই বর্ণনা লোক দেখানো আমলের নিষ্ফলতা তুলে ধরে।

নিয়ত অন্তরের বিষয়, যা এক অবস্থায় স্থির থাকে না। প্রতিনিয়ত অন্তরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তাই প্রতিদিনের কাজে নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য কিছু নির্দিষ্ট চর্চা প্রয়োজন। যেকোনো ভালো কাজ বা দায়িত্ব শুরু করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত: কাজটি আমি কেন করছি? এটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য?

যদি উত্তর হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাহলে শুকরিয়া আদায় করে কাজ শুরু করা উচিত। আর উত্তর বিপরীত হলে নিয়তকে শুধরে নিয়ে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কাজ শুরু করা প্রয়োজন। নফল ইবাদত, দান-সদকা বা অন্যান্য ভালো কাজ সম্পূর্ণ গোপনে করার অভ্যাস অন্তরে একনিষ্ঠতা বাড়াতে সাহায্য করবে। অন্তরের কলুষতা দূর করার জন্য আল্লাহর দরবারে হেদায়েত ও নিয়তের বিশুদ্ধতা চেয়ে নিয়মিত দোয়া করা অনেক বড় একটি হাতিয়ার।

আমাদের জীবন সীমিত সময়ের। এই অল্প সময়ে প্রচুর বাহ্যিক কাজ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সামান্য কাজকেও বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত করা। তাই বাহ্যিক কাজকর্মের সময় বারবার অন্তরের একনিষ্ঠতা যাচাই করে নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখাই বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...