কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশির দশকের ফ্যাশন ও নস্টালজিয়া নিয়ে নতুন ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে। জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই রেট্রো স্টাইলের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশির দশকের একটি বিশেষ ট্রেন্ড পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষ যেন টাইম মেশিনে চড়ে অতীতের স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছে। অনেকে এই সময়ে জন্ম না নিলেও এটি তাদের কাছে এক নতুন আবিষ্কারের মতো।
এই ট্রেন্ডে আশির দশকের ফ্যাশন, পুরনো দিনের চেহারা এবং নস্টালজিয়া মিলেমিশে ফেসবুকের টাইমলাইনকে একটি দারুণ ক্যানভাসে পরিণত করেছে। দৈনন্দিন নানা হতাশা ছাপিয়ে নাগরিক সমাজ একটি সম্মিলিত আনন্দে মেতে উঠেছে, যেখানে স্মৃতি একটি যোগসূত্র হিসেবে কাজ করছে।
মানুষ কেন আশির দশকে ফিরতে চাইছে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হতাশা কাটিয়ে পশ্চিমে ‘ভাইব্রেন্ট সিক্সটিজ’ মানুষকে আশাজাগানিয়া এক দারুণ রোমান্টিসিজমে ভাসিয়ে নিয়েছিল। সত্তরের দশকে ঔপনিবেশিক শক্তির পতন এবং সোভিয়েত যুগের অবসান ঘটছিল।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন পুঁজিবাদ বা অর্থনীতি তখন উত্তুঙ্গে ছিল। আশির দশকে মানুষের ভাবনা, চিন্তা, সংস্কৃতি বা জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন দেখা যায়, তাকে ভাইব্রেন্ট সিক্সটিজের রঙিন ও প্রাণবন্ত এক সম্প্রসারণ বলা যায়।
এমটিভির হাত ধরে সংগীত শুধু আর শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি দেখার অনুভূতিতেও পরিণত হয়েছিল। মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা ও কুইনের মতো শিল্পীদের পারফরম্যান্স সেখানে জাদুকরি চমক হিসেবে হাজির হয়। হলিউডে স্টার ওয়ার্সের যাত্রা শুরু হয় এবং স্টিভেন স্পিলবার্গ পপ কালচারের ক্ল্যাসিক উপহার দেন।
মেটাল, রক ও পপ কালচারের সঙ্গে প্রিন্সেস ডায়ানার জনপ্রিয়তা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। সব মিলিয়ে আশির দশক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে। এর প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল মানুষের জীবনযাত্রায়।
সানগ্লাস, ডেনিম জিনস, বড় বকলেসের বেল্ট, জ্যাকেট, স্টাইলিশ ব্লাউজ, বড় কানের দুল, চুড়ি, লম্বা বা কোঁকড়ানো চুল এবং আকর্ষণীয় হেয়ারস্টাইল এই দশকের ফ্যাশনের অংশ ছিল। এর সঙ্গে মোটরসাইকেলের প্রচলনও ছিল লক্ষণীয়। এভাবে ফ্যাশনজগতে নতুন ঢেউ নিয়ে আসে এই দশক।
তবে বাংলাদেশে এই ধাক্কা পড়তে শুরু করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর। এ কারণে নব্বই দশক নিয়ে এখানকার মানুষের মধ্যে বেশি স্মৃতিকাতরতা দেখা যায়। পশ্চিমে আশির দশক নিয়ে যে আবেগ, সেটি সেখানকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উছলে দিয়েছেন।
ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে এই প্রবণতা টিকটক হয়ে এখন ফেসবুকে ঝড় তুলেছে। ফেসবুকে কোনো ট্রেন্ড শুরু হলে বাঙালিরাও তাতে গা ভাসিয়ে থাকে। মানুষ শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, যুগল, পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেও আশির দশকের নস্টালজিক রঙে রাঙিয়ে তুলছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যে যেভাবে পারছে নিজেকে আশির দশকে হাজির করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন নতুন ট্রেন্ড আসে এবং যায়, তবে আশির দশক নিয়ে এই উন্মাদনা আলাদা কৌতূহল তৈরি করেছে। এর পেছনে ভিন্ন কোনো রহস্য আছে কি না, তা-ও খোঁজা হচ্ছে।
জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে আশি ও নব্বইয়ের দশকের পপ কালচার, ভলিউমিনাস হেয়ারস্টাইল, ডেনিম এবং রেট্রো ভাইবের প্রতি একটি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। এই ট্রেন্ড সেই আকর্ষণকে আরও উসকে দিয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে জীবনযাপন করা বা সে সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষদের স্মৃতিকাতরতা এই প্রবণতাকে আরও বেশি প্রবল করেছে।
কারো কারো ধারণা, কিম কার্দেশিয়ানদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে আশির দশক নিয়ে এই ট্রেন্ডিং শুরু করিয়েছেন। করোনা মহামারির পর ইরান যুদ্ধ, এর প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটসহ নানা কারণে আর্থিক চাপ ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফলে পশ্চিমা দুনিয়ায় বিক্রি কমেছে।
ফ্যাশনজগতে নতুন ট্রেন্ড হাজির করে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে ব্র্যান্ডগুলো আশির দশককে বেছে নিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এটি কতটা সত্য তা নিশ্চিত নয়, তবে পশ্চিমা দুনিয়ায় এমন প্রবণতার পেছনে বাণিজ্যিক কারণ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
রেট্রো স্টাইল বা ফ্যাশন বারবার ফিরে আসে। মানুষ একেক সময় অতীতের একেক সময়কে বেছে নেয় বা উদ্যাপন করে। সে হিসেবে আশির দশক নিয়ে এই স্মৃতিমেদুরতা এর ধারাবাহিক প্রবণতাই বলা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ার কারণে এবার আলাদা একটা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে।
আশির দশকের ছবি নিখুঁত ছিল না। তখন ফটোশপ ছিল না, ছবিতে একটু ফাটাফাটা বা দানাদানা ভাব থাকত। অনেক সময় মনে হতো হলদেটে রং বা জং লেগে আছে। এই অসম্পূর্ণতাই আজকের নিখুঁত ডিজিটাল দুনিয়ায় নান্দনিকতা তৈরি করেছে। আশির দশক পুনর্নির্মাণ করতে এখন সে সময়ের কিছুই লাগছে না, শুধু একটি ছবি আর একটি প্রম্পট দিয়েই আশির দশকের একটি আকর্ষণীয় ছবি তৈরি করা যাচ্ছে।
মতামত (0)