সারাদেশ

কুড়িগ্রামের তিস্তায় অসময়ে তীব্র ভাঙন, ২০ হাজার মানুষ শঙ্কায়

কুড়িগ্রামের তিস্তায় অসময়ে তীব্র ভাঙন, ২০ হাজার মানুষ শঙ্কায়
কুড়িগ্রামের তিস্তায় অসময়ে তীব্র ভাঙন, ২০ হাজার মানুষ শঙ্কায়
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা নদীর বুড়িরহাট ক্রসবাঁধে অসময়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ৪০ মিটার বাঁধের রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, এতে ২০ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে পড়েছে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীতে আবারও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে উপজেলার বুড়িরহাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ক্রসবাঁধের রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। এই অসময়ের ভাঙনে বাঁধটির নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ মিটার বাঁধের রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভাঙন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভাঙনের কারণে বড়দরগা, বুড়িরহাট, রামহরি, চতুরা, কালিরমেলা ও ডাংরারহাট এই ছয় গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাদের বসতভিটা, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং অন্তত পাঁচটি বাজার হুমকির মুখে পড়েছে। তিস্তা নদীর স্রোত তীব্র থাকায় বাঁধের নিচের অংশের মাটি ও বালু সরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া স্টেশনে পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৭৩ মিটার। সকাল ৯টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৭৫ মিটারে। ওই স্টেশনে তিস্তার বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার। সকাল ৯টার পরিমাপ অনুযায়ী, পানির উচ্চতা তখন বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার নিচে ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই বুড়িরহাট ক্রসবাঁধের রাস্তার কিছু অংশে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। পরে রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তা নদীর পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে একই এলাকায় প্রতিবছরই ভাঙন দেখা দেয়।

বুড়িরহাট এলাকার বাসিন্দা নূর আলম মিয়া বলেন, "প্রতিবছর এখানে জায়গা খালি ভাঙে। আগের বছরগুলাতেও এই জায়গা ভাঙছিল। জিও ব্যাগ দিয়ে নদী আটকানো যাবে না, এখানে ব্লক দিতে হবে। বড় নেতা আসে, তাও কোনো কাজ হয় না।"

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সালাম মিয়া (৫০) জানান, গতকাল নদীর স্রোত অনেক বেশি ছিল। গত বছরের মতো এবারও ভাঙনের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। তিনি আশঙ্কার কথা অনেককে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তখন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্রসবাঁধের জিও ডাম্পিং ও তীররক্ষা কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সালামের মাধ্যমে করা জিও ডাম্পিংয়ের কাজে নানা অসংগতি ছিল। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও নদীর তীররক্ষা ও মেরামতকাজ যথাযথভাবে করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় আব্দুর রহিম (৫০) বলেন, "এ বছর রাস্তার মেরামত কাজ হয়নি। উপরে শুধু বস্তা ফেলেছে, নিচে কোনো বস্তা দেয়নি।" খামার এলাকার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন (৪০) জানান, সকালে এসে দেখেন রাস্তা ভেঙে এলোমেলো হয়ে গেছে। তিনি বলেন, নদীর তীররক্ষার কাজ ভালোভাবে করা হয়নি, এই বাঁধ না থাকলে ফসলি জমি, বাড়িঘর কিছুই থাকবে না।

মেদনী গ্রামের বাসিন্দা সুলতান আলী (৩০) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যখন নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, তখন এমপি-মন্ত্রী, নেতা সবাই আসে। ভাঙন না থাকলে মেরামতের খবর থাকে না, তখন কাউকে পাওয়া যায় না।" বুড়িরহাট এলাকার আরেক বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম (৩৫) বলেন, শুকনা মৌসুমে এখানে বালু ছিল এবং একটি জায়গা অল্প ডেবে গিয়েছিল। তখন কাজ করা হয়নি। এখন পানি বেড়েছে, বালু নেই, কীভাবে ভাঙন সামলাবে, সব শেষ হয়ে যাবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন নদীভাঙন প্রতিরোধ ও তীররক্ষা কাজ একই ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং মানসম্মত কাজ নিশ্চিত করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই ক্রসবাঁধের ভাঙন শুধু একটি রাস্তার ক্ষতি নয়; এটি তিস্তার পানি ও স্রোত নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি বাঁধের দুর্বল অংশ চিহ্নিত করে স্থায়ী তীররক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, শুধু ভাঙনের পর বস্তা ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ তৈরি করলে প্রতিবছর একই জায়গায় সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...