আন্তর্জাতিক

মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতার কারণে শিশু হত্যা বৃদ্ধি, ব্যাপক উদ্বেগ

মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতার কারণে শিশু হত্যা বৃদ্ধি, ব্যাপক উদ্বেগ
মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতার কারণে শিশু হত্যা বৃদ্ধি, ব্যাপক উদ্বেগ
মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষের ওপর, বিশেষ করে শিশুদের ওপর, হামলা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ১৩ জন শ্বেতবর্ণতা আক্রান্তকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ জনই শিশু।

মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষের ওপর, বিশেষ করে শিশুদের ওপর, হামলার ঘটনা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত শ্বেতবর্ণতার কারণে ১৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০ জনই শিশু। নিহত শিশুদের বয়স নয় মাস থেকে ১৪ বছরের মধ্যে ছিল। শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষ হত্যার দিক থেকে এটিই দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ বছর।

দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর তোলিয়ারার কাছে গত মে মাসের শেষ দিকে রাতে নিকোল সোআলারার ঘরে তিন ঘাতক প্রবেশ করে। তারা তার ১৮ মাসের শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মেয়ে লানদ্রিয়াকে ছিনিয়ে নেয়। হামলাকারীরা নিকোলের স্বামীকে কাঠের খণ্ড ও কুঠার দিয়ে আঘাত করে। এরপর শিশুটিকে মায়ের কোল থেকে টেনে নিয়ে পালিয়ে যায়।

কয়েক দিন পর লানদ্রিয়ার মাথা ছাড়া শরীর একটি ওঝার বাড়িতে পাওয়া যায়। হতভাগ্য শিশুটির মাথা কয়েক কিলোমিটার দূরের একটি বাড়িতে প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় একটি স্যুটকেসে মেলে। অ্যালবিনোস মাদাগাস্কারের সভাপতি ফালজেন্স সোয়া এই পরিস্থিতিকে "খুবই সংকটপূর্ণ, খুবই নিষ্ঠুর" বলে মন্তব্য করেছেন। তার নিজেরও শ্বেতবর্ণতা রয়েছে এবং ২০২২ সালে তার সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

অ্যালবিনিজম একটি জিনঘটিত বা বংশগত বিরল রোগ। এই রোগে আক্রান্তদের শরীর ত্বক, চুল ও চোখের রঙ সৃষ্টিকারী রঞ্জক উপাদান মেলানিন খুব কম পরিমাণে তৈরি করে বা একেবারেই তৈরি করতে পারে না। এটি জন্মগত সমস্যা এবং এর কোনো নিরাময় বা ওষুধ নেই, তবে সঠিক যত্নের মাধ্যমে লক্ষণগুলো সামাল দেওয়া সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাব-সাহারান আফ্রিকায় শ্বেতবর্ণতার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো দেশে প্রতি ৪ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত হয়।

আফ্রিকার কয়েকটি দেশে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ ও অঙ্গহানির শিকার হতে হয়। স্থানীয় কুসংস্কার অনুযায়ী, শ্বেতবর্ণতা রোগীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধারণ করলে কিংবা এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরি কবচ ধারণ করলে ধনসম্পদ, রাজনৈতিক সাফল্য ও সৌভাগ্য আসে বলে বিশ্বাস করা হয়।

জাতিসঙ্ঘের স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ মুলুকা-অ্যান মিত্তি-ড্রামন্ড ২০২১ সাল থেকে মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতা রোগী হত্যার খবর পেতে শুরু করেন। তিনি জানান, ২০২০ সালের শেষ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৮টির বেশি হামলার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। হামলাকারীদের মধ্যে আত্মীয়, স্থানীয় মানুষ, অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষজন এবং গরু চোরও ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শুধু মধ্যস্থতাকারীরা ধরা পড়ে, তবে মূল পরিকল্পনাকারীরা আড়ালেই থেকে যায়।

মানবাধিকারকর্মীরা জানান, শিশু হত্যার বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। অনেক সময় একটি গোটা চক্র এতে জড়িত থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, নির্বাচনের আগেভাগে এই ধরনের হামলা বাড়ে বলেও দাবি করা হয়। কয়েকটি সূত্রের দাবি, কিছু হত্যার পেছনে উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

মাদাগাস্কার বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দিনে ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয় করে। খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি খাদ্যসংকট ও অপুষ্টিও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা সাবিনা লাউবারের মতে, টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা মানুষকে ক্ষতিকর কুসংস্কারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

হামলা এখন শুধু প্রত্যন্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০ বছর বয়সী ওদেত্তে তার চাচাতো ভাই ১৪ বছরের মার্সেলিনকে ফেব্রুয়ারিতে হারানোর পর থেকে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। মার্সেলিনেরও শ্বেতবর্ণতা ছিল। ওদেত্তে বলেন, "আমি মার্সেলিনের মতোই শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত। তাই আমি খুব ভয় পাই।" তিনি প্রায় এক ডজন মানুষের সাথে একটি ছোট কুঁড়েঘরে থাকছেন।

গত মে মাসে ১৪ বছরের রাকোটোমবেলো নিহত হওয়ার পর তার নয় বছর বয়সী বোন ভেরোলিন ও সাত বছর বয়সী ভাইকে মেয়রের বাড়িতে সশস্ত্র পাহারায় রাখা হয়েছে। হামলার রাতে ভেরোলিন একই ঘরে ঘুমাচ্ছিল এবং সে জানায়, কয়েকজন লোক দরজা ভেঙে তার ভাইকে নিয়ে যায়। পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট হামলাকারীদের ধরতে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের মাঠে নামিয়েছেন। ফার্স্ট লেডি দক্ষিণাঞ্চলে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ ও স্থানীয় সংগঠনগুলো এই সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।

সঠিক তথ্যের অভাবও একটি বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তা তোহোভেরি রাজাকামানানা সরকারকে দেশে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা জানতে একটি জরিপ চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তোলিয়ারায় মেয়েকে হারানো সোআলারার পরিবার এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তার আরেক মেয়ে প্যাট্রিসিয়ারও শ্বেতবর্ণতা রয়েছে। মেয়েটিকে হারানোর ভয়ে সোআলা কাজ করেন না এবং খুব কম বাইরে বের হন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...